সাধারণ নাগরিকদের মাঝে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা ও আকর্ষণ বাড়াতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে প্রশাসন।
নতুন সিদ্ধান্ত মোতাবেক, মূল গ্রাহক মৃত্যুবরণ করলে তাঁর জীবনসঙ্গী অর্থাৎ মনোনীত উত্তরাধিকারীর ভাতা ভোগের সর্বোচ্চ সময়সীমা বিদ্যমান পঁচাত্তর বছর থেকে বাড়িয়ে আশি বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা সনাতন সরকারি পেনশনের সুবিধাপ্রাপ্ত নন, তাদেরকে ‘প্রগতি’ নামের স্কিমে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। একই সঙ্গে শরিয়াহসম্মত ইসলামি পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে অর্থ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থতম আনুষ্ঠানিক সভায় এসব বিষয়ে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। নীতিনির্ধারণী এই বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠক শেষে সংস্থার নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান উপস্থিত সংবাদকর্মীদের জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জমাকৃত পেনশন তহবিলের বিপরীতে লভ্যাংশের সীমা ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশের ঘরে পুনর্নির্ধারণের অনুমোদন মিলেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষকে এই ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে নানামুখী সংস্কার ভাবা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা প্রারম্ভিক সময়ে চাঁদা প্রদান শুরু করেও পরবর্তীতে তা চালিয়ে যাননি, তাদের পুনরায় এই সুবিধার ভেতরে নিয়ে আসতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস নামে চারটি স্বতন্ত্র কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য ছিল বেসরকারি খাতের কর্মী, অনিয়মিত আয়ের শ্রমজীবী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি আনুষ্ঠানিক অবসর ভাতার কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করা। আনুমানিক দশ কোটি নাগরিককে সুরক্ষাবেষ্টনীতে নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছিল।
যাত্রা শুরুর পর তিন বছর অতিবাহিত হলেও এই চারটি খাতে এ যাবৎ তিন লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন নাগরিক নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যাঁদের সঞ্চিত তহবিলের পরিমাণ পৌঁছেছে ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকায়। অংশীদারদের পর্যবেক্ষণ, প্রথাগত ব্যাংকিং সঞ্চয়ের তুলনায় কম মুনাফা এবং অবসরে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাৎক্ষণিক আর্থিক সুরক্ষার অভাব থাকায় প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে অনেকেই প্রাথমিক কিস্তি দেওয়ার পর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেননি।
উত্তরাধিকারীর সুবিধায় পরিবর্তন
বিদ্যমান কাঠামোতে মূল সুবিধাভোগী মারা গেলে তাঁর জীবিত স্ত্রী বা স্বামী সর্বোচ্চ ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশনের অর্থ উত্তোলন করতে পারেন। যদিও কর্তৃপক্ষের দিক থেকে এটি আজীবন বহাল রাখার প্রাথমিক সুপারিশ ছিল, তবে পর্ষদ তা বাড়িয়ে আশি বছর পর্যন্ত কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৈঠকের আরও একটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো, রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন করপোরেশন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত যেসব কর্মী সরাসরি সরকারি পেনশন পান না, তাদের প্রগতি স্কিমের অধীনে আনা হবে। এসব সংস্থার জনবল মূলত নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিবিধি অনুসারে অবসরকালীন পাওনা পেয়ে থাকেন এবং সরকারি আমলাদের মতো পেনশন কিংবা আনুতোষিকের অধিকারী হন না। কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই সুবিধার আওতায় আসবে এবং তার রূপরেখা কী হবে, তা পরবর্তীতে বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া হবে।
মুনাফার হার প্রসঙ্গে ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, সামগ্রিক তহবিলের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও আয়-ব্যয়ের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেই লভ্যাংশ স্থির করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৬৮ থেকে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ হারে মুনাফা বণ্টন করা হবে, যা বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ।
আসছে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন
ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সর্বজনীন কর্মসূচিতে সম্পূর্ণ ইসলামি বা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ স্থানীয় বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো এই মডেল বাস্তবায়নে কাজ করছে এবং এ লক্ষ্যে স্বতন্ত্র বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হবে।
একই সাথে পেনশন উত্তোলনের শুরুর বয়স বিদ্যমান ৬০ বছর থেকে নামিয়ে ৫৫ বছরে নামিয়ে আনার বিষয়টিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। জনমিতির বাস্তব রূপ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে অ্যাকচুয়ারি বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা মিলবে।
চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যে ৬৬ এবং স্পেনে ৬৭ বছর বয়সে মানুষ অবসর সুবিধা পেয়ে থাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাজেই ৫৫ বছরে সুবিধা চালুর বিষয়টি আর্থিক স্থায়িত্বের সাথে কতটা সংগতিপূর্ণ, তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে।
আলোচনায় থাকা আরও কিছু সংস্কার
তহবিলে নিবন্ধনের পাঁচ বছর অতিবাহিত হলে গ্রাহক তাঁর জমাকৃত সমুদয় টাকা এককালীন তুলে নিয়ে কর্মসূচি থেকে বিদায় নিতে পারবেন কি না, এমন একটি প্রস্তাব পর্ষদে তোলা হয়েছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ছাড়পত্র না দিয়ে বিষয়টি আরও গভীর বিশ্লেষণের জন্য রাখা হয়েছে।
সূত্রের খবর, যেকোনো প্রয়োজনে নির্বিচারে টাকা তুলে নেওয়ার অনুমতি না দিয়ে বরং গুরুতর শারীরিক অক্ষমতাজনিত কারণে কেউ অসমর্থ হলে বীমার নিয়মে সঞ্চয় ফেরত দেওয়ার পথটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অংশগ্রহণকারীদের সঞ্চয়ের বিপরীতে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার আলোচনা উঠলেও তা এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। ঋণ দিলে তহবিলের কাঙ্ক্ষিত মুনাফায় কোনো টান পড়বে কি না কিংবা সাধারণ গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কি না, তা কারিগরি নির্দেশিকা অনুযায়ী পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এছাড়া পেনশনগ্রহীতাদের স্বাস্থ্যবীমার সুরক্ষায় আনার বিষয়েও প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। কোন মডেলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব এবং তাতে মূল তহবিলে কোনো আর্থিক সংকট দেখা দেবে কি না, তা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন সমন্বয়ের বিষয়টি তহবিলের আকার আরও স্ফীত না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থানে যুক্ত নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রবাসে পাড়ি জমানোর প্রাক্কালেই এই কর্মসূচির উপযোগিতা সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হবে। এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
পাশাপাশি প্রান্তিক এলাকায় গ্রাহক বাড়ানোর স্বার্থে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোর নিবন্ধন ফি বিদ্যমান ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকায় উন্নীত করার বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। একই সাথে ব্যাংক, ডাকঘর এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতাদের কমিশন কাঠামো চূড়ান্ত করার উদ্যোগও চলছে।