বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা প্রাণ কিংবা জিরো লাইনে পড়ে থাকা রক্তাক্ত লাশ সবসময়ই এক গভীর মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। তবে এই স্পর্শকাতর বিষয়টিকে আইনি ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে সরকার।
সীমান্তে অপরাধে জড়িয়ে পড়া এবং অবৈধভাবে সীমানা অতিক্রমের জেরে যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, সেগুলোকে ঢালাওভাবে ‘বর্ডার কিলিং’ বা সীমান্ত হত্যা হিসেবে আখ্যা দেওয়া সমীচীন নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে এই নতুন আইনি ব্যাখ্যার অবতারণা করেন। একই সঙ্গে দেশের অখণ্ডতা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষার্থে যেকোনো ধরনের জোরপূর্বক পুশব্যাক বা অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর মনোভাবের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
আসন্ন বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক নিয়ে আলোচনার সময় স্বাভাবিকভাবেই সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানির বিষয়টি সামনে আসে। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের উদ্দেশে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যে বিষয়টিকে বর্ডার কিলিং বলা হচ্ছে, তার খুঁটিনাটি বিস্তারিত জানা থাকলে মূল্যায়ন করা সহজ হতো।
সীমান্তের আইনি পরিধি এবং অপরাধের ধরন স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি কোনো বিদেশি বাহিনী আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে কিংবা জিরো লাইনে এসে কাউকে হত্যা করে, তবেই কেবল তাকে সীমান্ত হত্যা বলা চলে। কিন্তু যদি দুই দেশের নাগরিকেরা নিজ নিজ সীমানার অভ্যন্তরে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় কিংবা অবৈধভাবে অন্য দেশের সীমানায় অনুপ্রবেশ করে, তবে সংশ্লিষ্ট সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। এই ধরনের ঘটনাকে কোনোভাবেই বর্ডার কিলিং বলা যৌক্তিক নয়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বিজেপি প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তে ‘বাংলাদেশি’ অজুহাতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে পুশইন বা পুশব্যাকের জন্য জড়ো করার খবরে সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ বিষয়ে সরকারের সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রশাসন এই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং বিজিবি বর্ডারে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো ধরনের অননুমোদিত পুশইন বা পুশব্যাকের প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
তবে মানবিকতা ও আইনি প্রক্রিয়ার মেলবন্ধন বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, যদি বাংলাদেশের কোনো বৈধ নাগরিক যেকোনো পরিস্থিতিতে ওপারে গিয়ে থাকেন এবং সে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার যদি জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়, তবে আইনি প্রক্রিয়া মেনে তাদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে এই ধরনের কোনো তালিকা বর্তমানে সরকারের কাছে পেন্ডিং বা প্রক্রিয়াধীন নেই। অতীতে যদি এমন কিছু থেকে থাকে, তবে তা অবশ্যই আইনি নিয়ম মেনে নিষ্পত্তি করা হবে।
প্রতি বছরের নিয়মিত রুটিন হিসেবে এবারও বিজিবি ও বিএসএফের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের বিষয়ে আলোকপাত করে মন্ত্রী জানান, দুই দেশের মহাপরিচালক পর্যায়ের এই সম্মেলন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, যা পর্যায়ক্রমে দুই দেশে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আসন্ন এই বৈঠকে সীমান্তের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুই দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পারস্পরিক সমস্যাগুলো কীভাবে নিরসন করা যায়, সেই সমস্ত দ্বিপক্ষীয় বিষয় টেবিলে উত্থাপন করা হবে।