সোমবার, 21 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুরে ৪ জনকে হত্যা: পুলিশ

রংপুর মহানগরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, শিক্ষকের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ার পর পরিচিত ওই দুই যুবক একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে।

ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুরে ৪ জনকে হত্যা: পুলিশ

রংপুর মহানগরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, শিক্ষকের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ার পর পরিচিত ওই দুই যুবক একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তারা সম্পর্কে আত্মীয় এবং দুজনের বাড়িই নগরের কোতোয়ালি থানার মাছুয়াপাড়া এলাকায়। রোববার ভোরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি বাড়ির ছাদ টপকে গণপতি চক্রবর্তীর (৬৫) বাড়ির ছাদে ওঠে। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। এ সময় ছাদে মানুষের চলাচলের শব্দ শুনে সেখানে যান গণপতি চক্রবর্তী। দুই যুবককে দেখে তিনি তাদের সেখানে আসার কারণ জানতে চান।

মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ওই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় গণপতি তাদের চিনতেন এবং তারা তাঁকে 'স্যার' বলে সম্বোধন করত। ধরা পড়ে যাওয়ার পর তারা গামছা গলায় পেঁচিয়ে গণপতিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশ জানায়, গণপতি আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে সেখানে ধস্তাধস্তি হয় এবং তাঁর গোঙানির শব্দ শোনা যায়। শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে হত্যাকারীরা সিঁড়ির মধ্যেই কাপড় পেঁচিয়ে তাঁকেও শ্বাসরোধে হত্যা করে।

বাবা-মায়ের চিৎকার শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তাঁদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৩)। তাকেও হত্যা করা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা জানান, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়ম (১২) হত্যাকারীদের পরিচিত ছিল। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বর সঙ্গে প্রিয়মের খেলাধুলার সম্পর্ক ছিল। পুলিশ বলছে, প্রিয়ম জীবিত থাকলে হত্যাকারীদের চিনে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তাকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার মুখে বালিশ চাপা দেওয়া হয়।


হত্যার পরও ইয়াবা সেবন


পুলিশ কমিশনারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার পরও মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের আচরণে অস্বাভাবিকতার প্রকাশ দেখা যায়নি। প্রথমে তারা ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায়। এরপর প্রিয়মকে যে কক্ষে হত্যা করা হয়েছিল, সেই কক্ষের বাথরুমে গিয়ে প্রথমে সিদ্ধার্থ এবং পরে মুগ্ধ গোসল করে।

গোসল শেষে তারা ডাইনিং টেবিলে বসে। সেখানে রাখা একটি বয়াম থেকে খেজুর খাওয়ার পাশাপাশি সঙ্গে থাকা ইয়াবাও সেবন করে।

পুলিশ জানায়, হত্যার প্রকৃত কারণ আড়াল করতে পুরো ঘটনাটিকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে তারা। এ জন্য ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে ফেলা হয়।

সিদ্ধার্থ গত আট বছর ধরে পিকে পাল জুয়েলার্সে স্বর্ণের কারিগর হিসেবে কাজ করায় আসল ও নকল স্বর্ণ শনাক্ত করতে পারত। পুলিশ বলছে, লুটপাটের সময় সে একটি চুড়ি আগুনে পুড়িয়ে সেটির স্বর্ণ যাচাই করে।

তদন্তে আঙুলের ছাপ এড়াতে বাসা ছাড়ার আগে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানির বালতিতে ডুবিয়ে রাখে তারা। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত তারা এসব কাজ করে। পরে জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা থাকায় লুট করা স্বর্ণালংকার নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

বের হওয়ার পথে মন্দিরের পেছনে একটি পরিত্যক্ত স্থানে স্বর্ণালংকারগুলো লুকিয়ে রাখে তারা। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সেগুলো উদ্ধার করে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, শুরুতে ঘটনাটি ডাকাতি নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা নিয়ে পুলিশের মধ্যে সংশয় ছিল। তবে ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের আলামত, অর্ধেক খাওয়া শসা এবং আগুনে পোড়ানো স্বর্ণের চুড়ি পাওয়ার পর তদন্তকারীদের ধারণা হয়, স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ কেউ এর সঙ্গে জড়িত।

তিনি বলেন, সিদ্ধার্থ স্বর্ণকারের দোকানে কাজ করতেন। তদন্তে পুলিশের সেই সন্দেহই শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, ঘটনাস্থলে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার চার্জশিট দাখিল করে আসামিদের বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।