পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের কার্যক্রম আরও এক ধাপ এগিয়েছে। প্রয়োজনীয় ভৌত পরীক্ষা-নিরীক্ষা (ফিজিকস টেস্ট) সম্পন্ন হওয়ার পর ইউনিটটিতে ‘স্টেজ-সি’ বা ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। এ পর্যায়ে ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তা সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান। তিনি জানান, বায়েরা চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান প্রথম ইউনিটে ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ কার্যক্রম শুরুর অনুমতি দিয়েছেন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের ফিজিকস টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর স্টেজ-সি পর্যায়ের কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এ ধাপে কেন্দ্রের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, ফিজিক্যাল স্টার্টআপের ধাপ পেরিয়ে কেন্দ্রটি এখন পাওয়ার স্টার্টআপ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী সংস্থাকে বায়েরা ট্রায়াল অপারেশনাল অনুমোদন দিয়েছে।
তিনি জানান, স্টেজ-সি পর্যায়ে শুরুতে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা শূন্য থেকে ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। এ সময় চুল্লি, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের শীতলীকরণ ব্যবস্থা, টারবাইন-জেনারেটর, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। এসব ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে কি না, তাও যাচাই করা হবে।
এ পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জেনারেটরকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা। গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে টারবাইনের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা, জেনারেটর এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা কম রেখে পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার ফলাফল ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়ানো হবে। রিঅ্যাক্টরের তাপীয় ক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। এ পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে এ সময়সীমা নির্ভর করছে পরীক্ষার ফলাফল, কমিশনিং কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণের ওপর।
বিদ্যুৎকেন্দ্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পাওয়ার স্টার্টআপের অনুমোদন, জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু— তিনটি আলাদা ধাপ। পরীক্ষামূলক সরবরাহ শুরু হলেও কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই চলবে। বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম শেষ করার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব শর্ত পূরণ করতে হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদনের কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা ছিল গত সেপ্টেম্বরে। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় তা পিছিয়ে যায়। পরে ত্রুটি সংশোধন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে বায়রার অনুমোদন নিয়ে গত ১১ অক্টোবর প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার পরও পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে সাত থেকে আট মাস। এ সময় বিভিন্ন পর্যায়ে কেন্দ্রটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করা হবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান এনপিসিবিএল। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট এখানে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে।
দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। কেন্দ্রটি থ্রি প্লাস জেনারেশন প্রযুক্তিতে নির্মিত হচ্ছে। নকশা অনুযায়ী, এর আয়ুষ্কাল ৬০ বছর।
প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি ও অন্যান্য আর্থিক কারণে ব্যয় বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।