শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ আজ

বাংলা চলচ্চিত্রে এমন কিছু নাম আছে, যাদের জনপ্রিয়তা কেবল একটি প্রজন্মে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তম কুমার তেমনই এক কিংবদন্তি, যিনি পর্দার হাসি, সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি আর অনন্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। মৃত্যুর চার দশক পেরিয়ে গেলেও তার সেই আবেদন আজও ম্লান হয়নি। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই মহানায়কের আজ জন্মশতবর্ষ।

মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ  আজ

বাংলা চলচ্চিত্রে এমন কিছু নাম আছে, যাদের জনপ্রিয়তা কেবল একটি প্রজন্মে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তম কুমার তেমনই এক কিংবদন্তি, যিনি পর্দার হাসি, সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি আর অনন্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। মৃত্যুর চার দশক পেরিয়ে গেলেও তার সেই আবেদন আজও ম্লান হয়নি। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই মহানায়কের আজ জন্মশতবর্ষ।

উত্তম কুমারের নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার স্বতন্ত্র হাসি, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে কালজয়ী জুটি এবং রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তার বিপুল জনপ্রিয়তা। তবে তাকে কেবল প্রেমের ছবির নায়ক হিসেবে দেখলে তার অভিনয়জীবনের বড় একটি অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। কারণ তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিজের তৈরি তারকা-ইমেজের মধ্যে আটকে না থাকা। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের সেই পরিচয়কে ভেঙে নতুন চরিত্র ও নতুন অভিনয়শৈলীতে নিজেকে বারবার হাজির করেছেন তিনি।

অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবির মধ্য দিয়ে। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকটা ছিল কঠিন সংগ্রামের। পরপর কয়েকটি ছবিতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় ব্যর্থ অভিনেতার তকমাও তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। তবে ১৯৫২ সালের ‘বসু পরিবার’ এবং পরের বছর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তার ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। বিশেষ করে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তার জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন এক জনপ্রিয়তার দ্বার খুলে দেয়।

পঞ্চাশের দশকে উত্তম কুমারের পরিচয় ক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হয় রোমান্টিক নায়ক হিসেবে। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘সপ্তপদী’সহ নানা ছবিতে প্রেম, বিচ্ছেদ ও আবেগের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শককে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তার অভিনয়ের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অতিরিক্ত নাটকীয়তার পরিবর্তে চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর এবং শরীরী ভাষায় অনুভূতি প্রকাশ করা। ফলে অনেক সময় তার অভিব্যক্তিই সংলাপের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠত।

ষাটের দশকে উত্তম কুমারের অভিনয়ে আসে নতুন বাঁক। শুধু তার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানোর বদলে তিনি চরিত্রের ভেতরের জটিলতা ও মনস্তত্ত্ব তুলে ধরার দিকে মন দেন। ‘এন্থনি ফিরিঙ্গি’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘চিড়িয়াখানা’ ও ‘নায়ক’-এর মতো চলচ্চিত্রে তার চরিত্রগুলো আগের রোমান্টিক নায়ক-ভাবমূর্তির তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল হয়ে ওঠে।

এই পরিবর্তনের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’। ১৯৬৬ সালে নির্মিত এই ছবিতে উত্তম কুমার অভিনয় করেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকায়। বাহ্যিকভাবে সফল ও আত্মবিশ্বাসী এই তারকার অন্তর্জগতে ছিল ভয়, অনুশোচনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অতীতের নানা চাপ। সেই দ্বন্দ্বকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলাই ছিল চরিত্রটির মূল চ্যালেঞ্জ। উত্তম কুমার তার নিজের তারকা-পরিচয়ের অভিজ্ঞতাকেই যেন অভিনয়ের অংশ করে তোলেন।

‘নায়ক’ তাই শুধু একটি সফল চলচ্চিত্র নয়, উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ছবির অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবের উত্তম কুমারের তারকা-পরিচয়ের তুলনা করার সুযোগ তৈরি হয় দর্শকের সামনে। একজন সফল নায়কের পর্দার পরিচয় আর তার ব্যক্তিগত সত্তার মধ্যকার দূরত্বকে অভিনয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট করে তোলেন তিনি।

সত্তরের দশকে উত্তম কুমারের অভিনয়ের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়। ‘অমানুষ’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘মৌচাক’, ‘সব্যসাচী’, ‘দুই পৃথিবী’সহ বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেন। কখনো রহস্যঘেরা চরিত্র, কখনো গম্ভীর ব্যক্তিত্ব, আবার কখনো সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত মানুষের ভূমিকায় দেখা গেছে তাকে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের তারকা-ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করেছেন তিনি।

এ জায়গাতেই উত্তম কুমার আলাদা হয়ে ওঠেন সমসাময়িক অনেক জনপ্রিয় নায়কের চেয়ে। তিনি শুধু দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করেননি, প্রয়োজনে নিজের জনপ্রিয় ভাবমূর্তির বিপরীত পথেও হেঁটেছেন। তার ক্যারিয়ারে যেমন বাণিজ্যিকভাবে সফল ছবি রয়েছে, তেমনি সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কাজও আছে। ফলে জনপ্রিয়তা ও অভিনয়গুণ—দুই পরিচয়ই তার ক্ষেত্রে পাশাপাশি এগিয়েছে।

অভিনয়ের বাইরে চলচ্চিত্রের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন উত্তম কুমার। প্রযোজনা, পরিচালনা, চিত্রনাট্য রচনা, সংগীত পরিচালনা এবং গান গাওয়ার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রকে শুধু অভিনয়ের মাধ্যম হিসেবে না দেখে নির্মাণের বিভিন্ন স্তরেও নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়েছেন এই শিল্পী।

উত্তম কুমারের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল নিজেকে পরিবর্তন করার সক্ষমতা। পঞ্চাশের দশকের স্বপ্নের রোমান্টিক নায়ক ষাটের দশকে পরিণত হন আরও জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রের অভিনেতায়। সত্তরের দশকে তার অভিনয়ে আসে আরও পরিণত চরিত্রের বিস্তার। এই ধারাবাহিক পরিবর্তনই তাকে দীর্ঘ সময় দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে ধরে রাখে।

তার মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে ৪৬ বছর। তবু উত্তম কুমারকে ঘিরে আলোচনা থামেনি। সময়ের সঙ্গে তার অনেক চলচ্চিত্র নতুন দৃষ্টিতে মূল্যায়িত হয়েছে। জন্মশতবর্ষে সেই মূল্যায়ন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ তার অভিনয় এখন শুধু অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়; অভিনয়শিল্প, চলচ্চিত্রের ভাষা এবং তারকা-সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

‘মহানায়ক’ অভিধাটি তাই উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে শুধু জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি নয়। এটি একজন অভিনেতার দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় পথচলার প্রতিফলন। ব্যর্থতার তকমা পাওয়া এক তরুণ অভিনেতা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় নায়ক, এরপর তারকা, বহুমাত্রিক অভিনেতা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এটাই—তিনি শুধু নিজের সময়ের চলচ্চিত্রকে প্রতিনিধিত্ব করেননি, বরং তার অভিনয় সেই সময়ের মানুষের রুচি, আবেগ, স্বপ্ন ও ভালো লাগাকেও প্রভাবিত করেছে। আর সেই কারণেই পর্দার নায়ক উত্তম কুমার সময়ের সীমানা পেরিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের চিরন্তন ‘মহানায়ক’ হয়ে উঠেছেন।