লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলা ও স্থল আগ্রাসন নতুন মাত্রা পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করেই দেশটি দক্ষিণ লেবাননে আরও সেনা মোতায়েন করছে।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, ১৬২তম ডিভিশনের সেনারা তথাকথিত ‘বাফার জোন’ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দক্ষিণ লেবাননে নতুন অভিযান চালাবে। এই ডিভিশনটি ইতোমধ্যে সেখানে মোতায়েন থাকা আরও দুটি ডিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
এর আগের দিন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি মোকাবিলায় দক্ষিণ লেবাননে বৃহত্তর নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ভূখণ্ডে রকেট হামলা চালায়। এর পর থেকেই মার্চের শুরুতে লেবাননের ওপর ইসরায়েলের হামলা আরও তীব্র হয়।
ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে বিমান ও স্থল হামলা চালানোর পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চল এবং রাজধানী বৈরুতের উপকণ্ঠের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা দেশটিতে বড় ধরনের মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ১১৬ জন নিহত এবং ৩ হাজার ২২৯ জন আহত হয়েছেন।
সংঘাত কমাতে আন্তর্জাতিক মহল বারবার আহ্বান জানালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত সপ্তাহে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি ও কানাডা সতর্ক করে জানায়, ইসরায়েলের স্থল অভিযান আরও বিস্তৃত হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।
তবে এসব সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ইসরায়েলি সেনারা লেবাননের আরও ভেতরে অগ্রসর হচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের ঘরে ফিরতে দেওয়া হবে না।
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে ফোনালাপে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম ইসরায়েলের স্থল আগ্রাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্যমতে, তিনি বলেন—ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ও উসকানিমূলক বক্তব্য লেবাননের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন।
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে এবং ইসরায়েলের এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে বিশ্ব সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে আহ্বান জানানো হবে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংসের চিত্র অতীতের ‘নৃশংস অপরাধ’-এর স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। তারা অভিযোগ করে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো সহিংসতার প্রতিচ্ছবি এখন লেবাননেও দেখা যাচ্ছে।
সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের জনজীবন ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত করেছে এবং আরও ধ্বংসযজ্ঞের হুমকি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ইসরায়েলকে দায়বদ্ধ করতে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার গোষ্ঠীটি দাবি করে, তারা ৪৫টির বেশি হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে রকেট, ড্রোন এবং লেবাননের ভেতরে থাকা ইসরায়েলি সেনাদের ওপর আক্রমণ রয়েছে।
তারা আরও জানায়, গাইডেড মিসাইল ব্যবহার করে ইসরায়েলের কয়েকটি সাঁজোয়া যান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যার মধ্যে সীমান্ত শহর দেইর সিরিয়ানে দুটি ‘মারকাভা’ ট্যাঙ্ক রয়েছে।
ইসরায়েলি সূত্র অনুযায়ী, দেশটির নাহারিয়া শহরে হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে এক ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একজন সদস্য নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।