আর্কাইভ
ads
logo

দ্বিজাতি তত্ত্বের অসারতা ও পাকিস্তান দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশকাল: ২৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৫ পি.এম
দ্বিজাতি তত্ত্বের অসারতা ও পাকিস্তান দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ছবিঃ সংগৃহীত

ads

পাকিস্তান দিবসটি বাংলাদেশে বেশ জোরেশোরে পালন করা দরকার। তাতে অনেক ভাবনার অবকাশ মিলবে। আমাদের সন্তানেরা জানবে যে ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’ নামক এক অদ্ভুতুড়ে চিন্তার বিচিত্র বিকাশ আর করুণ পরিণতি কি করে এখনো গোটা উপমহাদেশের কণ্ঠশূল হয়ে আছে। তাকে পুরনো ক্ষত বলে খারিজ করার উপায় নেই। সেই কাঁটা প্রায়ই তাঁর বেদনাময় অস্তিত্বের জানান দেয়।

পাকিস্তানের জাতির জনক মোহম্মদ আলী জিন্নাহ দাবী করে বসলেন যে ভারতীয় হিন্দু আর মুসলমান আসলে আলাদা দু’টি জাতি আর তাই তাদের দরকার আলাদা দুই দেশ। বিশেষ করে মুসলমানদের। ১৯৪০-এর ২৩শে মার্চ লাহোরে মুসলিম লীগ যে প্রস্তাব গ্রহন করল তাতে বলা হল যে ভারতের উত্তরপশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে যেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল আছে, তা নিয়ে স্বাধীন দেশসমূহ গঠন করতে হবে। প্রথমে ‘স্টেটস’ কথাটা বলা হলেও, জিন্নাহ পরে সংশোধন করে ‘স্টেট’ করলেন। ‘স্টেটস’ ধারণাটিকে উড়িয়ে দিলেন ‘টিপোগ্রাফিক্যাল এরর’ বলে। প্রস্তাব উত্থাপন করিয়ে নিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক সাহেব কে দিয়ে। কণ্ঠ তাঁর স্বর জিন্নাহ’র। ২৩ মার্চ তাই পাকিস্তান দিবস। সে যাই হোক, ‘পাকিস্তান’ শব্দটিই কিন্তু এই প্রস্তাবে নেই। না থাকাটা বিচিত্র কিছু না। চৌধুরী রহমত আলী নামের এক তরুণ ১৯৩৩ সালে যে ‘পাকিস্তান’ নামটি প্রথম চাউর করেছিলেন, তিনি কতগুলো প্রদেশের নামের আদ্যক্ষর আর অন্ত্যাক্ষর ব্যবহার করে তৈরি করলেন সেই নাম। পাঞ্জাবের ‘পি’, আফগান প্রদেশের (যাকে এখন উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বলা হয়) ‘এ’, কাশ্মীরের ‘কে’, সিন্ধের ‘এস’ আর বালুচিস্তানের ‘স্তান’ – এই নিয়ে ‘পাকস্তান’ বা ‘পাকিস্তান’ । এর মধ্যে লক্ষণীয়ভাবে নেই ‘বাংলা’। পরে অবশ্য একটা জোড়া তালি দিয়ে বলা হল যে ‘পাক’ হল গিয়ে পবিত্র আর ‘স্তান’ মানে স্থান, তাই পাকিস্তান হল গিয়ে পবিত্রভূমি।

তো সেই পবিত্রভূমি’র মানচিত্র কি হবে সে বিষয়ে কারো কোন ধারণা ছিল বলে মনে হয় না। জিন্নাহ’র পিতৃভূমি ছিল ‘গোন্ডাল স্টেট’ নামের এক বৃটিশ স্বীকৃত প্রিন্সলী স্টেটে, এক রাজপুত রাজার শাসনাধীনে। এখন সে রাজ্য নেই, তবে জায়গাটা আছে ভারতের গুজরাটে। জিন্নাহ্ ব্যারিস্টার হয়ে প্র্যাকটিসে পসার জমিয়েছিলেন বোম্বে’তে (এখন ভারতের মুম্বাই)। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, যাকে বলা হয় পাকিস্তান আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক সুতিকাগাড়, তা পড়েছে ভারতের উত্তরপ্রদেশে। পাকিস্তান আন্দোলনের বাঙালি পুরোধাব্যক্তিদের মধ্যে সোহরাওয়ার্দী’র বাড়ি ছিল কলকাতায়, আর আবুল হাশিম জন্মেছিলেন বর্ধমানে। মাওলানা ভাসানী তো ছিলেন আসাম মুসলিমলীগের নেতা। আসামের ভাসানে কৃষকদের জন্যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলায়, আসামিরা তাঁকে ভালবেসে ‘ভাসানী’ উপাধি দিয়েছিলেন। আর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান জন্মেছিলেন ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের কারনালে। শেষকালে বিপদ-বুঝে সোহরাওয়ার্দী শরৎ বসুকে সাথে নিয়ে স্বাধীন বাঙলা বলে যখন দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেন, ততদিনে পাকিস্তানের জল গড়িয়ে নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে।

আর এতদিনে পাকিস্তানী ঐতিহাসিকেরা (আয়েশা জালাল) বলতে শুরু করেছেন যে, জিন্নাহ আসলে পাকিস্তান চান নি। পাকিস্তান দাবী আসলে ছিল একটি দরকষাকষি’র ঘুঁটি (bargaining chip)। এর মাধ্যমে, ভারতীয় মুসলমানদের ক্ষমতার কেন্দ্রে অপ্রাসঙ্গিক হওয়াটা তিনি ঠেকাতে চেয়েছিলেন। সে কথা অবিশ্বাসই বা আপনি করবেন কি করে বলুন। যে দশ কোটি মুসলমানকে নিয়ে তিনি পাকিস্তান আন্দোলন করলেন, তাদের মধ্যে চার কোটিকে ছেড়ে এলেন ভারতে। যাবার সময় পরামর্শ দিলেন ভালো ভারতীয় হয়ে ওঠার। ভারতীয় মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হলে গেল। পশ্চিম-বাঙলা আর পূর্ব-পাঞ্জাবের মুসলমানেদের একাংশ ছুটলেন পূর্ব আর পশ্চিমে। নিজভূমিতে অপাংকতেয় হয়ে, সীমানা পাড়ি দিয়ে হলেন উদ্বাস্তু। বিহারের উর্দুভাষী মুসলমানদের সংকট একই সাথে ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক। তারা হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে না গিয়ে সীমানার কাছে সাংস্কৃতিকভাবে বৈরী পূর্ববাঙলায় এসে পড়লেন। এসে প্রজন্মান্তরে আত্মপরিচয় সংকটে পড়লেন। মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হলেন। ভারতের পুর্ব পাঞ্জাব থেকে পাকিস্তানের পশ্চিম পাঞ্জাবে পৌঁছালেন এক ট্রেন ভর্তি মৃত মুসলমান। পাকিস্তানি হতে চেয়েছিলেন। শুধু সংখ্যা হয়ে রয়ে গেলেন। মানুষ হিন্দু-মুসলমান কিছুই না হয়ে, পশু হয়ে উঠল। বন্য আদিমতায় হত্যা করল বন্ধুকে, ধর্ষণ করল প্রতিবেশীর বালিকা কন্যাকে।

আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেই জিন্নাহ বললেন আজ থেকে আর কেউ হিন্দু বা মুসলমান নয়, নয় কেউ পাঞ্জাবি বা বাঙালি। সকলেই পাকিস্তানি। বিভ্রান্ত তাই পাকিস্তানিরাও কম হলেন না।

শুধু ধর্ম দিয়ে জাতি গঠন করা যায় না, সে সত্য পাকিস্তানীরা টের পেলেন। পশ্চিমাঞ্চলে তাও কিছুটা ভৌগলিক ও জলবায়ুগত ঐক্য আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য পাওয়া গেল। কিন্তু ১২০০ মাইল দূরের বাঙলাকে নিয়ে পাকিস্তানিরা পড়লেন চরম অস্বস্তিতে। বাঙালির সকল ভাষিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে তারা পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির শত্রুজ্ঞানে তার উপর খড়গহস্ত হলেন। একবার রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করেন, তো আরেকবার আরবি হরফে বাঙলা লিখতে চান, না হয় মুসলমানি বাঙলা প্রচলনের নামে বাঙলার খোল নলচে পাল্টে বাঙলাকে আরবি-ফারসি শব্দের শ্বাসরুদ্ধকর খোঁয়াড়ে পরিণত করার তুঘলকি কাণ্ড চালাতে থাকলেন। তারপর একদিন এক অবিস্মরণীয় রক্তক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে বাঙালিরা এই অসার, অপদার্থ, পশ্চাতমুখী পাকিস্তান থেকে বেড়িয়ে এলো। প্রত্যাখ্যান করল ভ্রান্ত, দুরভিসন্ধিমূলক, দরকষাকষি’র ঘুঁটি খ্যাত দ্বিজাতি তত্ত্ব-কে।

আর পাকিস্তান? সে কি জাতি গঠন করতে পেরেছিল? বেলুচ’রা সেখানে স্বাধীনতার জন্য ফুঁসে উঠেছে। শেখ মুজিবের নামে শ্লোগান দিচ্ছে। তাঁদের নেতা পরিষ্কার বলেছেন যে, পাকিস্তানের চেয়ে বেশি মুসলমান আর কোন দেশ কখনো হত্যা করে নি। কাদিয়ানী, আহমেদিয়া, শিয়া এসব নিরীহ ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার অব্যাহত রেখেছে। অন্য দেশের প্ররোচনায় নিজেদের দেশে আফগান তালেবানদের ট্রেনিং দিয়েছে। সেই দেশ এক আল-কায়েদা নেতাকে তাদের দেশে ঝটিকা সামরিক অভিযান চালিয়ে তাদের সার্বভৌমত্বকে উপেক্ষা করে হত্যা করেছে। দেশ শাসন করতে অবিরাম দরকার হচ্ছে ডান্ডাওয়ালা মিলিটারির। সিভিলিয়ান সরকার মিলিটারির আধিপত্য মেনে নিয়ে কাজ করে, তাদের তোয়াজ করে চলে। মসজিদে জুম্মার নামাজের সময় সন্ত্রাসী হামলায় মানুষ প্রাণ হারায় আর বিপন্ন অর্থনীতির অধিকাংশ বাজেট খরচ করে সামরিক খাতে।

আসুন, আমরা পাকিস্তান দিবস পালন করি, যেমন করে পালন করেছিলাম ১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চে।

 লেখক,
 ব্যারিস্টার আসিফ বিন আনওয়ার

ads

এই বিভাগের আরও খবর

এই বিভাগের আরও খবর

ads
ads
manusherkotha

manusherkotha

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ