মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দীর্ঘকালীন একতরফা আধিপত্য ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিতে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ জায়োনিস্ট দেশটির প্রতি ক্রমবর্ধমান অনীহা এবং কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ঐতিহাসিক বেলফোর চুক্তি। যে চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি গঠন হয় এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করে। যেসব ইউরোপীয় দেশ ঐতিহাসিক সমর্থনের পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে বা ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেসব দেশের কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো আলোচনা করা হল।
পোলিশ পার্লামেন্টে নজিরবিহীন সমালোচনা
পোল্যান্ডের সংসদ অধিবেশনে একজন আইনপ্রণেতা সরাসরি ইসরায়েল রাষ্ট্রটিকে 'হিটলারীয় রাষ্ট্র' হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই বক্তব্যে সংসদের একটি বড় অংশ করতালির মাধ্যমে সমর্থন জানায়। পরবর্তীতে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত 'অ্যান্টি-সেমিটিজম' বা ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুললে উক্ত পোলিশ এমপি আরও কঠোর অবস্থান নেন। তিনি বর্তমান সেই রাষ্ট্রের পার্লামেন্টকে হিটলারের 'থার্ড রাইখ'-এর সাথে তুলনা করে নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন।
ইতালির অস্ত্র চুক্তি স্থগিত ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য
ইতালি সরকার ইসরায়েলের সাথে বিদ্যমান অস্ত্র চুক্তির 'স্বয়ংক্রিয় নবায়ন' (Automatic Renewal) স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ঘোষণার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে ব্যক্তিগত ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ করেন। তবে এই আক্রমণের ফলে ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ঐক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। দেশটির বিরোধীদলীয় নেত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের স্বার্থে এবং প্রধানমন্ত্রীর এই সাহসী সিদ্ধান্তের পেছনে তারা ঐক্যবদ্ধ।
স্পেনের দৃঢ়তা ও চীনের উত্থান
স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আমেরিকার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনের সাথে বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার হুমকি দেওয়ার পরদিনই সানচেজ চীন সফরে যান। সেখানে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার পাশাপাশি তিনি বিশ্ব শান্তির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন। তার এই তৎপরতায় 'আমেরিকা-বিহীন ন্যাটো'র একটি প্রচ্ছন্ন সুর পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় চীন একটি দূরদর্শী ও কার্যকর শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
ইউরোপের সামগ্রিক চিত্র ও আমেরিকার ভূমিকা
বর্তমানে সমগ্র ইউরোপ জুড়েই উক্ত রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক ও অস্ত্র চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করার দাবি জোরালো হচ্ছে। ইউরোপ যখন এমন কঠোর অবস্থানে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা একতরফাভাবেই দেশটিকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের প্রবল বাধা সত্ত্বেও একটি বড় অংকের সামরিক সহায়তা বিল পাস হয়েছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আগামী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দল থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা শীর্ষ নেতাদের কেউই এই সামরিক সহায়তার পক্ষে ভোট দেননি।
ভবিষ্যতের ইঙ্গিত ও বেলফোর চুক্তির প্রাসঙ্গিকতা
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীলতা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে এক বিশাল পরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৪৮ সালের বিতর্কিত বেলফোর চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট এই রাষ্ট্রের যে 'অপ্রশ্নযোগ্য দায়মুক্তি' ছিল, তা এখন শেষের পথে। ধারণা করা হচ্ছে, ১৯৪৮ সালের সেই চুক্তির শতবর্ষ পূর্ণ হওয়ার আগেই ইতিহাসের এই বিতর্কিত অধ্যায়টি বৈশ্বিক জনমতের চাপে আমূল পরিবর্তিত হতে পারে।
(মোজাম্মেল হক ত্বোহার ফেসবুক পোস্ট থেকে সংশোধিত)







