বিশ্ব রাজনীতিতে একটি প্রচলিত কথা আছে—"মধ্যপ্রাচ্যে যখন সর্দি লাগে, সারা বিশ্ব তখন কাশতে শুরু করে।" আর এই কাশির তীব্রতা যদি নিউমোনিয়ায় রূপ নেয়, তবে তার আঁচ সবচেয়ে বেশি লাগে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অদ্ভুত এবং কৌতূহলদ্দীপক সমাপতন লক্ষ্য করা যায়। তা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ বা জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার সাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকি সৃষ্টি হওয়ার একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র।
নব্বইয়ের দশকের শুরু: উপসাগরীয় যুদ্ধ ও চ্যালেঞ্জ
১৯৯১ সালে দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর যখন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবার ক্ষমতায় বসেন, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে দামামা বাজছিল। ১৯৯০-৯১ সালের সেই উপসাগরীয় যুদ্ধ (Gulf War) বিশ্ব বাজারে তেলের দামে চরম অস্থিরতা তৈরি করে।
সে সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর। কুয়েত থেকে রেমিট্যান্স আসা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় নবজাতক গণতান্ত্রিক সরকারকে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। যদিও বিএনপি সেই সময় এই ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া মূল্য দেশীয় মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিয়েছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করে।
২০০৩: ইরাক আক্রমণ ও দ্বিতীয় মেয়াদের ধাক্কা
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করার মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০০৩ সালে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইরাক অভিযান’ (Invasion of Iraq)। সাদ্দাম হোসেনের পতনের সেই যুদ্ধ কেবল ইরাকের মানচিত্র বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল বিশ্ব জ্বালানি বাজারের সমীকরণ।
তেলের ব্যারেল প্রতি দাম আকাশচুম্বী হওয়ার প্রভাবে বাংলাদেশে ডিজেল ও কেরোসিনের তীব্র সংকট দেখা দেয়। সারের দাম বৃদ্ধি এবং লোডশেডিংয়ের মতো জনদুর্ভোগ সরকারকে ভীষণ অজনপ্রিয় করে তোলে। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, বিএনপি যখনই বড় কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
২০২৬: নতুন প্রেক্ষাপট ও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ
বর্তমানে ২০২৬ সালে বিএনপি পুনরায় সরকার গঠনের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সরাসরি সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এক মহাপ্রলয় সৃষ্টি করেছে। হরমোজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও ভয়াবহ। নতুন সরকার হিসেবে বিএনপি যখন বাজার স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এই বৈশ্বিক সংকট তাদের সামনে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি সরকারকে এক কঠিন রাজনৈতিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এটি কি কেবলই সমাপতন?
রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় একে 'এক্সটার্নাল শক' বলা হলেও বিএনপির জন্য এটি যেন এক ‘ঐতিহাসিক দুর্ভাগ্য’। মধ্যপ্রাচ্যের আগুনের তাপে বারবার বিএনপির অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তার পারদ পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী কূটনৈতিক ও কৌশলগত জ্বালানি নিরাপত্তা নীতি। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যেমন অনিশ্চিত, বিএনপির ভাগ্যও যেন সেই অনিশ্চয়তার সাথে এক অদৃশ্য সুতায় বাঁধা।
তথ্যসূত্র:
BP Statistical Review of World Energy: নব্বইয়ের দশক এবং ২০০৩ সালের তেলের দামের তুলনামূলক চিত্র।
The Gulf War and its Impact on Developing Economies: বিশ্বব্যাংকের বিশেষ প্রতিবেদন (১৯৯২)।
ইরাক যুদ্ধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম (বিবিসি, আল জাজিরা): ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন সংকট বিষয়ক সংবাদ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস (১৯৯১-২০০৬): মহিউদ্দিন আহমদ







