আর্কাইভ
ads
logo

মিয়ানমারের বহুমুখী ভূ-রাজনীতি এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংকট

সম্পাদকীয়

প্রকাশকাল: ২ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:২১ এ.এম
মিয়ানমারের বহুমুখী ভূ-রাজনীতি এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংকট

ছবি: গ্রাফিক্স, দ্য ভয়েস২৪

ads

‘অনন্ত গৃহযুদ্ধের দেশ’ মিয়ানমার। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত স্থিতিশীল কোনো সরকার নেই। একাধিক জাতিগোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল এবং সামরিক বাহিনীর চলমান সংঘর্ষ ৭০ বছরের ইতিহাসে কোনো পর্যায়েই দীর্ঘ সময় থেমে থাকেনি। দশকের পর দশক ধরে চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে দেশটি আজ এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ সাত দশকের গৃহযুদ্ধ, সামরিক শাসন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে দেশটি কার্যত খণ্ড-বিখণ্ড। ২০২৬ সালের এই মুহূর্তে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং বিশ্ব পরাশক্তিদের স্বার্থের সংঘাতের এক উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ইতিহাসের উত্তরাধিকার ও অং সান সু চি

মিয়ানমারের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আধুনিক মিয়ানমারের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল অং সান ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে আততায়ীর হাতে নিহত হন। তার কন্যা অং সান সু চি দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দী থাকার পর ২০১০ সালে মুক্তি পান এবং ২০১৫ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেন। কিন্তু তার রাজনৈতিক উত্থান যতটা উজ্জ্বল ছিল, পতন ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নিপীড়ন ও গণহত্যার পক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতে সমর্থন দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে তার 'গণতন্ত্রের আইকন' ভাবমূর্তি হারান। ২০২১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শান্তিতে নোবেলজয়ী এই নেত্রীকে আবারও বন্দী করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জান্তা সরকার একটি 'প্রহসনের নির্বাচন' অনুষ্ঠান করলেও সু চিকে সেই প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয়েছে এবং সম্প্রতি তাকে দীর্ঘ কারাদণ্ড থেকে গৃহবন্দিত্বে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট ও আরাকান ইস্যু

আরাকান বা রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখন মিয়ানমারের সবচেয়ে জটিল ক্ষত। ২০১৭ সালের সেই ‘টেক্সটবুক এথনিক ক্লিনজিং’ বা জাতিগত নিধনের ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন আজ আরও অনিশ্চিত। রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নেই; বরং বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (AA) এখন এই রাজ্যের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে, আরসা (ARSA)-র মতো গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। আরাকান ইস্যু এখন স্বায়ত্তশাসনের লড়াই ছাপিয়ে পরিণত হয়েছে জান্তা বনাম বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এক মরণপণ অনিশ্চিত যুদ্ধে, যে যুদ্ধের ক্রীড়ানক হিসেবে কলকাঠি নাড়ছে পরাশক্তির দেশগুলো।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি

মিয়ানমারের এই জাতিগত ও রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের জন্য সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করেছে। সীমান্তে প্রায়ই গোলাগুলি, আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং নতুন করে শরণার্থী প্রবেশের আশঙ্কা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মির সাথে জান্তা বাহিনীর সংঘাতের ফলে উদ্ভূত অরাজকতা বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
আরসা ও কুকি-চিনের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উথ্বান এবং তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আদর্শ পার্বত্য অঞ্চলে বাংলাদেশের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এক বক্তব্যে বলেছেন- বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যাধুনিক সক্ষমতা সম্পন্ন হলে, পার্বত্য চট্রগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।
সেনাপ্রধান তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবেই এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সংকটগুলোকে নির্দেশ করেছেন। পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাধিক সংঘর্ষ হয়েছে, এমনকি বন্দুকযুদ্ধে সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। 

ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও বিশ্ব পরাশক্তি

মিয়ানমার তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চীন, ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


চীন: মিয়ানমারকে তাদের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) এর গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবে দেখে। জান্তা সরকারকে সরাসরি সমর্থন দিলেও চীন পর্দার আড়ালে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করছে।


রাশিয়া: মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে উন্নত সমরাস্ত্র ও জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখতে সচেষ্ট। রুশ অস্ত্রের বিশাল বাজার হয়ে উঠেছে মিয়ানমার, এই অস্ত্র বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতেও রাশিয়া বরাবর নিজস্ব প্রভাব প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ: গণতন্ত্রপন্থীদের সমর্থন এবং জান্তার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিলেও তাদের প্রভাব স্থলভাগে অত্যন্ত সীমিত। তবে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য চট্রগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। সেইন্টমার্টিন এবং উপকূলীয় সীমান্তবর্তী রাজ্য হওয়ায় রাখাইনের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে প্রাধান্য দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে মার্কিন প্রশাসন। প্রতিবেশী তিন দেশের(বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার) খ্রিষ্টান অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে একটি আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গুঞ্জনে শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন উৎস থেকে।

মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ: একটি অন্ধকার টানেল?

২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মিয়ানমারের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ দেখা যায়:


১. খণ্ড-বিখণ্ড রাষ্ট্র: জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো (যেমন আরাকান আর্মি, কেএনইউ) যদি তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে, তবে মিয়ানমার একটি অকার্যকর ও বিভক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
২. দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ: জান্তা সরকার যদি রাশিয়া ও চীনের সমর্থনে টিকে থাকে এবং বিদ্রোহীরা যদি চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে যায়, তবে দেশটির অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।
৩. ফেডারেল গণতন্ত্র: এটিই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পথ, যেখানে সব জাতিগোষ্ঠীর সমান অধিকার থাকবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জান্তা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে এমন কোনো সমঝোতার লক্ষণ নেই।

মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত, কোনো সরল সমীকরণ নেই। একটি স্থিতিশীল মিয়ানমার কেবল সে দেশের মানুষের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য। বিশ্ব সম্প্রদায় যদি কেবল নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের জন্য চীন ও রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়, তবে মিয়ানমার আগামী কয়েক দশক এশিয়ার সবচেয়ে বড় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়েই থাকবে।

তথ্যসূত্র:
১. কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (CFR): 'Civil War in Myanmar | Global Conflict Tracker', ২০২৬।
২. রিলিফওয়েব (ReliefWeb): 'Myanmar Crisis Situation Analysis', মার্চ ২০২৬।
৩. ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স (IDEA): 'Myanmar's Fragmented Future Report', এপ্রিল ২০২৬।
৪. রয়টার্স ও বিবিসি নিউজ আর্কাইভ (২০২১-২০২৬): মিয়ানমার অভ্যুত্থান ও অং সান সু চির রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা।
৫. আইএসপি-মিয়ানমার: 'Strategic Review and Foresight 2025-2026'।

ads

এই বিভাগের আরও খবর

এই বিভাগের আরও খবর

ads
ads
manusherkotha

manusherkotha

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ