আর্কাইভ
ads
logo

কাউছার আহমেদের কলাম

নির্বাসিত জীবন থেকে প্রধানমন্ত্রী: ক্ষমতার পোশাক বদলাচ্ছেন তারেক রহমান?

The Voice

প্রকাশকাল: ৮ মার্চ ২০২৬, ১১:৩৭ পি.এম
নির্বাসিত জীবন থেকে প্রধানমন্ত্রী: ক্ষমতার পোশাক বদলাচ্ছেন তারেক রহমান?

ads

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান, ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন পার করে দেশে ফেরেন গত বছরের শেষ দিকে। ফেরার সময় দেশে নির্বাচনের বাতাস বইছিল, সেই বাতাসে উড়াল দিয়ে দুই-তৃতীয়াংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন তিনি।

বিদেশে বসে নিজের দল পরিচালনা করেছেন। দলের মধ্যে ভাঙ্গন ধরতে দেন নি। ক্ষমতায় বসে নজিরবিহীনভাবে জীবনযাত্রায় খুব বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েও খুব সাধারণ জীবনযাপন করছেন। লন্ডনে নির্বাসিত থাকাকালীনই তার সাধারণ জীবনযাপনের কিছু চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যেন আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন।

যেহেতু রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রধান তিনি, তাই তাকে আমরা রাষ্ট্রের সিইও বলতে পারি। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সিইও হিসেবে তিনি অফিস গমন করছেন নিয়মিত ৷ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে অফিসই মূলত তার কাছে যেতে বাধ্য ৷ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমনই। সেখানে তিনি নিজেই সচিবালয়ে গিয়ে সময়মত অফিস করছেন। সিইও সময়মত অফিস করলে অধীনস্তদের উপরও সময় মেনে নিয়মিত অফিসে আসার চাপ পড়ে। আসলে হয়েছেও তাই। শুধু নিয়মিত সাধারণের মত অফিসে যাওয়া নয়, সিকিউরিটি ও প্রটোকলও কমিয়েছেন তিনি। সাধারণ মানুষের মত রাস্তায় জ্যামে বসে থাকছেন। 

অতি সম্প্রতি বিদেশ ফেরতের সময় প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানানোর যে লম্বা লাইন থাকতো, সেখানেও তিনি লাগাম টেনেছেন ৷ছুটির দিনে অফিস করছেন। এছাড়াও তার পোশাক-পরিচ্ছদেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি আগের চেয়ে অনেক সাধারণ। পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর চালচলনেও। অপরের প্রতি সম্মান দেখানোর রীতি তিনি বেশ ভালোভাবেই চর্চা করছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে  প্রধানমন্ত্রীর পদে যেই আড়ম্বর দেখা যেত তার পুরোটাই তিনি ঝেড়ে ফেলেছেন।

আমি জানি না এটা তিনি স্বভাবগতভাবেই করছেন নাকি তার প্রচারের জন্য করছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে আমাদের উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে মুজিকাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। হোসে মুজিকাকে বলা হয় গরীব প্রেসিডেন্ট। মুজিকা আদতে এলিট পরিবারভুক্তই ছিলেন। ছিলেন একসময়ের গেরিলা যোদ্ধা। ২০০৯ সালে তিনি উরুগুয়ের ক্ষমতায় আসেন। 

হোসে মুজিকা ক্ষমতায় এসে সরকারী বাসভবন ব্যবহার করেন নি। নিজের ফার্মহাউজে থাকতেন। নিজের একটি পুরনো গাড়ি তিনি ব্যবহার করতেন, বেতনের সিংহভাগ দান করে দিতেন ৷এমনকি তিনি নিজের চেক শার্টের সাথে সাদা নীল টাই ব্যবহারর বাদ দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। হোসে মুজি খুব জোরের সাথে বলেছিলেন, বর্তমান সভ্যতা বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব, সাধারণীকরণ, পরিবার, ভালোবাসার বিরোধী। এখনকার প্রধান বিপর্যয় হলো ক্ষমতাহীন রাজনীতি। আমাদের এখান থেকেই যুদ্ধটা শুরু করতে হবে। এছাড়াও তিনি বলেছিলেন, তুমি একজন প্রেসিডেন্ট বলে সাধারণ মানুষ হওয়া ছেড়ে দিও না ৷ 

তারেক রহমানকে মুজিকার সাথে তুলনা দেওয়ার সময় এখনো আসে নি৷ সাধারণ জীবনযাপন তারেক রহমানের সদিচ্ছা নাকি প্রচার কৌশল সেটা বোঝার জন্য আরো সময় অতিবাহিত হতে হবে।

তারেক রহমানের বর্তমান জীবনাচরণে তিনটি সম্ভাব্য প্রভাব থাকতে পারে। প্রথম, তার প্রতি জনআস্থা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা। জনগণ তাদের প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের কাছাকাছি এবং আপন মনে করবে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। মানুষজন যানজটে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির পাশে ছবি, ভিডিও দিচ্ছে। যদিও কেউ কেউ তার নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বেগ দেখিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটা শক্ত বার্তা দেওয়া যাচ্ছে৷ ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকি অবস্থান তৈরি করছে। গত নির্বাচনে প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের ইশতেহারেই ছিলো দুর্নীতি দমন।  কিন্তু এখানে মজার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে দুর্নীতি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। এসব দুর্নীতি নৈতিকতার বাণী দিয়ে আজ পর্যন্ত রোধ করা সম্ভব হয় নি। দুর্নীতি রোধের একমাত্র উপায় হচ্ছে প্রতিষ্ঠানিকভাবে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। রাষ্ট্রের পলিসি যেন অলিগার্কদের জন্য তৈরি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। যদিও দুর্নীতি বিরোধী একটা বার্তা দিতে পেরেছেন তারেক রহমান, তবে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য তাকে শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জোরদার করতেই হবে। 

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে৷ ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের পর একটা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আলাপ বেশ জোরেশোরেই উঠেছিলো। দেশের বৃহত্তম ও ক্ষমতাসীন  রাজনৈতিক  দল বিএনপি। নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি দেশে প্রবর্তন করতে চাইলে বিএনপিই সেটা পারবে। বিএনপি নিজেদের পরিবর্তন করলেই দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি রাজনীতিকদের মাঝে পরিবর্তন চলে আসবে। 

২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের পর নেতাদের প্রতি যেই নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তার বাস্তবায়নের একটা বার্তা হতে পারে তারেক রহমানের বর্তমান জীবনাচরণ। 

তবে ব্যক্তিগত সরলতা, সাধারণ জীবনাচরণ দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। বিশ্বে এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি বিলাসবহুল জীবনযাপন করেও রাষ্ট্রের উন্নতি করেছেন। কারণ রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রসাশন ও কার্যকর নীতি। তাই ব্যক্তি তারেক রহমানের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছিল তারা পলিসি নির্ভর রাজনীতি করবে, যার আওতায় তারা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জও অনেক। তাদের পলিসির মধ্যে শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ, এবং জ্বালানি নিরাপত্তা অগ্রগামী হওয়া উচিত। তারা অবশ্য নিজেরাও বলছে এগুলোতে তারা গুরুত্ব দিবে। সংসদের ওয়ার্কিং কমিটিগুলোতে বিরোধী দলীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা ভবিষ্যতে সমালোচকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখব জনাব তারেক রহমান তার বর্তমান সাধারণ জীবনযাপন আসলেই সদিচ্ছা থেকে বেছে নিয়েছেন কী না। যদি সেটা সত্যিই হয় তাহলে আমরা বলতে পারব, যদি প্রধানমন্ত্রী এমন হয় তাহলে মানবতার আশা এখনো জিইয়ে রাখা যায়৷

ads

এই বিভাগের আরও খবর

এই বিভাগের আরও খবর

ads
ads
manusherkotha

manusherkotha

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ