ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর দলীয় কার্যক্রমে ব্যাপক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বিএনপিতে। দেশ পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পূর্ণ মনোযোগ থাকায় মাঠপর্যায়ে দল গোছানোর কাজ প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। রাজপথের কর্মসূচি কিংবা অভ্যন্তরীণ তৎপরতা না থাকায় প্রান্তিক স্তরে নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নিষ্ক্রিয়তা। সরকারি কাজে দলীয় নেতাদের অতিরিক্ত সম্পৃক্ততার বিপরীতে সাংগঠনিক কাঠামো ক্রমশ শিথিল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৃণমূল থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সারা দেশের সিংহভাগ জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলোর কার্যকারিতা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। কোথাও কয়েক বছর, আবার কোথাও এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কোনো সম্মেলন হয়নি। মূল দলের পাশাপাশি চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও চরম নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে। নিয়মিত কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব না আসায় পদপ্রত্যাশী বহু যোগ্য নেতা হতাশ হয়ে পড়ছেন। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, দ্রুত সম্মেলন ও সময়োপযোগী কর্মসূচি না এলে মাঠপর্যায়ের কর্মচাঞ্চল্য পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
সারাদেশে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে মাত্র আটটি কমিটি বিধিসম্মত মেয়াদের মধ্যে রয়েছে। বাকি ৭২টিরই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে বহু আগে। এছাড়া চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি দীর্ঘদিন ধরে বিলুপ্ত এবং শেরপুর জেলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি দুই বছর অন্তর কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে সেই নিয়মের প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে নেতৃত্বের স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর মতে, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রভাবশালী নেতাদের একাংশ ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ও রাজধানীতে তদবির বাণিজ্যে ঝুঁকে পড়ায় সাংগঠনিক ভিত্তির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
এদিকে মূল দলের সঙ্গে যুক্ত ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রত্যেকটির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈধ মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়েছে। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল কিংবা মহিলা দলের মতো প্রভাবশালী সংগঠনগুলোতেও নতুন নেতৃত্ব আসার প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে। ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিললেও অদৃশ্য প্রভাবশালীদের তৎপরতায় নতুন কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতারা বর্তমানে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এবং কৃষক দলের শীর্ষ ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত থাকায় সংগঠনগুলোতে কার্যকর সময় দিতে পারছেন না। মহিলা দল, শ্রমিক দল ও মুক্তিযোদ্ধা দলের মতো সংগঠনগুলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নতুন কোনো সম্মেলন দেখেনি।
সংগঠনের এমন পরিস্থিতির বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে রাষ্ট্রকে একটি সুশৃঙ্খল ধারায় ফেরাতে গিয়ে দলের স্বাভাবিক রুটিন কার্যক্রমে কিছুটা বিলম্ব ঘটছে। তবে প্রশাসন পরিচালনার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই মেয়াদোত্তীর্ণ সকল কমিটি ভেঙে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দলকে পুনরায় গতিশীল করা হবে।