শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

জামায়াতের সঙ্গে জোট ও দলীয় সংস্কার নিয়ে মতবিরোধ, এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট গঠন, নির্বাচনি কৌশল, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরেছেন তিনি

জামায়াতের সঙ্গে জোট ও দলীয় সংস্কার নিয়ে মতবিরোধ, এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট গঠন, নির্বাচনি কৌশল, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে সামান্তা শারমিনকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আগের কমিটিতে তিনি ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। নতুন কমিটিতে পদমর্যাদা কমে যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়।

তবে ফেসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন পদত্যাগের পেছনে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট গঠনের বিরোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রায় এক বছর আগে জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। জামায়াতকে নীতিগত বা কৌশলগত কোনো দিক থেকেই মিত্র হওয়ার উপযুক্ত মনে করেননি তিনি। তাঁর মতে, এই জোটের কারণে এনসিপিকে বড় মূল্য দিতে হবে।

পোস্টে তিনি জানান, গত ১১ মাসে দলের অতীত কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি আলোচনা, বিতর্ক ও মতাদর্শিক লড়াইয়ের মাধ্যমে দলকে নিজের অবস্থান থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। তবে এনসিপি তার প্রাথমিক মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকতে পারবে বলে মনে করেন না তিনি।

পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে সামান্তা শারমিন চারটি প্রধান বিষয় তুলে ধরেছেন। প্রথমত, জামায়াতের সঙ্গে জোটের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অসংগতি; দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের নির্বাচনে এনসিপির নির্বাচনি কৌশল; তৃতীয়ত, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন; এবং চতুর্থত, কাউন্সিল না করে দলের আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন।

জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে সামান্তা শারমিনের বক্তব্য, এনসিপির রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। এ জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি ছিল। কিন্তু জামায়াত এই তিনটি বিষয়কে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও রাষ্ট্রচিন্তার অংশ মনে করে না বলে তাঁর দাবি।

তিনি আরও লিখেছেন, জামায়াতের দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক নয়। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রয়োজন থেকেই দলটি সংস্কারের কথা বলে। জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ এনসিপির সংস্কারের রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

২০২৬ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে সামান্তা শারমিনের দাবি, ওই নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া না রেখে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা ছিল। পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যারা পরিবর্তন চান, তাদের সঙ্গে জোট করা অথবা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ এনসিপির সামনে ছিল। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে দলটি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা ক্ষুণ্ন করেছে।

তিনি জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনি কৌশলে অংশ না নিয়েও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির পাঁচটি পদ্ধতির কথা তিনি দলের নেতৃত্বকে বলেছিলেন। তবে নেতৃত্ব সেসব প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে নির্বাচনি জয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে সংস্কারবিহীন ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানানোর গ্রহণযোগ্যতাও হারিয়েছে দলটি।

নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে সামান্তা শারমিন লিখেছেন, শহীদ ওসমান হাদি ঢাকার একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে এককভাবে নতুন ধরনের নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর ন্যূনতম ৫০০ ভোট পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। অথচ বড় দলের সঙ্গে জোট করার কারণ হিসেবে ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের যুক্তি অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ও অধিকার নিয়ে সামান্তা শারমিনের বক্তব্য, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও রক্ষাকর্তা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। ব্যারিকেডের সামনে তাঁদের অবস্থান ও সক্রিয়তা আন্দোলনকে সার্বজনীন রূপ দিয়েছিল। কিন্তু বিজয়ের পর পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য হিস্যার দাবিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে।

তাঁর অভিযোগ, পুরোনো দলগুলোর বাইরে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ থাকলেও এনসিপি সে পথে এগোয়নি। নারী সদস্যদের শুধু দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দলটি বরং রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিল রেখে কাজ করেছে।

সামান্তা শারমিনের মতে, নারীরা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ। তাঁদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা। ঐতিহাসিক বৈষম্য দূর করতে নারীদের শুধু সমান সুযোগ নয়, বরং অধিক প্রতিনিধিত্ব, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আন্দোলনের সময় নারীদের সামনের সারিতে রাখা কি তাঁদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি ছিল, নাকি বিপদের মুখে তাঁদের উপস্থিতিকে নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল? তাঁর বক্তব্য, আন্দোলনের সময় নারীদের সাহস ও ত্যাগ গ্রহণ করা হলেও বিজয়ের পর তাঁদের মর্যাদা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা অস্বীকার করা হলে তাঁদের অংশগ্রহণের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।

দলের পুনর্গঠন প্রসঙ্গে সামান্তা শারমিন বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশা করেছিল, যার নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক কাঠামো ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা প্রচলিত দলগুলোর চেয়ে আলাদা হবে। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, পরিবারতন্ত্র, পদ-পদবি বণ্টনে স্বজনপ্রীতি, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব এবং ভিন্নমত দমনের প্রবণতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর মতে, দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার অন্যতম উপায় হলো নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন। কাউন্সিল না করে আবার আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করায় এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে নেতৃত্বের বৈধতা, জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী মত দমনে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যবহৃত পদ্ধতিই অনুসরণ করেছে এনসিপি।

পোস্টের শেষাংশে সামান্তা শারমিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভিন্নমত, বিশ্বাস ও পরিচয়ের মানুষকে একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ ছিল। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপি সেই সম্ভাবনা তৈরি করতে পারত, কিন্তু সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব ও সিদ্ধান্তের কারণে তা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, নতুন রাজনৈতিক শক্তির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে বিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধ করা। সেই ঐক্যের ভিত্তি হতে হবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন অঙ্গীকার। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান ভিত্তি করার আহ্বান জানান তিনি। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেন।

এ ছাড়া নারীর স্বাধীন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব, জাতীয় পুঁজির বিকাশ, দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং দেশের সম্পদ ও নীতিনির্ধারণে জনগণের স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলোকে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

সামান্তা শারমিন বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন দল গঠন নয়; বরং এমন রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজন রাজনীতির চালিকাশক্তি হবে না। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে আগ্রহীদের যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।