জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনের জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান বিচারক।
রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলমের আদালতে এ ঘটনা ঘটে। পরে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলে বিচারক আবার এজলাসে ফেরেন। শুনানি শেষে আদালত আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে (ইডি) হুমকি এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে করা মামলায় আখতারুজ্জামানের জামিন শুনানি ছিল রোববার।
দুপুর ২টা ৩৮ মিনিটের দিকে মাথায় হেলমেট ও হাতে হাতকড়া পরিয়ে আখতারুজ্জামানকে এজলাসে তোলা হয়। এর আগেই বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের উপস্থিতিতে আদালতকক্ষ পূর্ণ হয়ে যায়। আখতারুজ্জামানকে তোলার প্রায় দুই মিনিট পর বিচারক জামসেদ আলম এজলাসে ওঠেন।
এজলাসে দাঁড়ানো নিয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা ও হট্টগোল শুরু হয়। একপর্যায়ে তারা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দুপুর ২টা ৪১ মিনিটের দিকে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী এবং আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাকের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। প্রায় দুই মিনিট পর আবার এজলাসে ফেরেন বিচারক।
এ সময় হাত তুলে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আখতারুজ্জামান বলেন, "আমার পক্ষে ১০ জন আইনজীবী কথা বলবেন। ১০ জনের শুনানি করার অনুমতি প্রার্থনা করছি।"
এরপর আখতারুজ্জামানের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক জামিনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সবকিছুর সিটিটিভির ভিডিও আছে। শুধু মারধর করার দৃশ্য নাই। মুল ব্যাপার হলো, রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড। তিনি নতুন দলে যোগদান করেছেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে মামলা সৃজন করা হয়েছে। তিনি অসুস্থ, ৭৩ বছর বয়স্ক লোক। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তার জামিন চাইছি। "
এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আখতারুজ্জামান কথা বলতে চাইলে বিচারক বলেন, "সবাই একসঙ্গে কথা বললে তো শুনতে পাব না। একজন একজন করে বলেন।"
পরে জামিনের বিরোধিতা করে মামলার বিষয়বস্তু তুলে ধরেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী।
বিমানবন্দরের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "প্রতিবাদ করার ধরন আছে। ধরন যদি ঠিক না থাকে, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। তাদের (জামায়াতে ইসলামী) একটা কাজ হচ্ছে উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ না করে দেশকে অস্থিতিশীল করা যায় কীভাবে, সেটা করা।"
গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে যোগ দেন একসময়ের বিএনপি নেতা আখতারুজ্জামান। বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে তিনি দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “বিএনপি বহু দলের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ নিমক খেয়ে ভুলে যায়। অন্য দলে যোগদানের জন্য মামলা দিতে হবে, এমনটা বিএনপি করে না।”
জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবীদের উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, "আমাদের মধু খেয়ে বেঁচে ছিলেন।"
এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা। এতে আদালতকক্ষে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়। তখন ওমর ফারুক বলেন, "আপনারা রাজনীতি না আনলে আমিও আনতাম না। এমন মানসিকতা আমাদের নেই।”
জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “তারা ফেইসবুকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে যাকে ইচ্ছে, যা-তা বলেন। উনি যে কাজ করেছেন তা অপরাধ। মামলা জামিন অযোগ্য ধারায়। প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। জামিন পেলে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাবেন। জামিনের বিরোধিতা করছি। আর তুচ্ছ ঘটনা থেকে এমন কিছু না, আরও রহস্য আছে।"
ওমর ফারুকের বক্তব্যের বিষয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, "দায়িত্বশীল পদে থেকে তার এ ধরনের বক্তব্য আশা করি না। তিনি 'বাতিল মাল' বলে আসামিকে মন্তব্য করেন। এসময়ও আদালতে উত্তেজনা তৈরি হয়।”
তিনি আরও বলেন, "উনাদের ভূমিকা পজিটিভ হওয়া দরকার। তিনি জামিন পাওয়ার হকদার। তার জামিন প্রার্থনা করছি।"
এর জবাবে ওমর ফারুক বলেন, "আখতারুজ্জামান ফ্যাসিস্টের পক্ষে গিয়ে নির্বাচন করেছেন। জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, এর ভিডিও আছে। নিজেকে বাঁচাতে জামায়াতে আশ্রয় নিয়েছে। জামায়াতে ইসলাম তাকে আশ্রয় দিয়েছে আমাদের গালাগালি করতে।"
দুই পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন এবং তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আখতারুজ্জামানকে আদালতে হাজির করা হবে—এ খবর পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা আদালতপাড়ায় জড়ো হন। তারা তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্লোগানও দেন।
শুনানি শেষে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা আদালতের নিচে গিয়ে জামায়াতপন্থিদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় কয়েকজনের সঙ্গে তাদের তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে কয়েকজনকে মারধর করে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
পরে জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা তাদের পক্ষের লোকজনকে রক্ষা করতে সেখানে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
বৃহস্পতিবার সকালে মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্বকে কেন্দ্র করে আখতারুজ্জামানের উচ্চবাচ্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামানকে শাহজালাল বিমানবন্দরের ইডি গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে উদ্দেশ করে বলতে শোনা যায়, “ঘাড় ধরে বের করে দেব, ঘাড় ধরে বের করে দেব। আপনারা কাজ করেন না, কিছু করেন না, তদবির করে পোস্ট নেন। মাইর খাইতে চান?”
এরপর শুক্রবার ভোরে বিমানবন্দর থানায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা কর্মকর্তা শাহরিয়ার আলম সজিব।
ওই মামলায় আদালত আখতারুজ্জামানকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন। রিমান্ড শেষে রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। জামিন শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।