নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণ, ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামাল দেওয়া এবং সরকারি চাকুরেদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বিশাল আকারের বাজেট তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আসন্ন বাজেটের আয়তন ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বাজেটের ব্যপ্তি বৃদ্ধির এই হার নজিরবিহীন হতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের উচ্চমূল্যের কারণে কেবল আগামী চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতেই ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রয়োজন। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে এসব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে আরও প্রায় সাড়ে ৩৮ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি গুণতে হবে। এই বিশাল আর্থিক চাপ সামাল দিতে সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে ৩০০ কোটি ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার জরুরি বাজেট সহায়তার সন্ধানে নেমেছে। আগামী জুনের মধ্যে এই ঋণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি শাখা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ অবস্থানপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য সংকটের মুখে পড়েছে। এই ঋণসহায়তা পাওয়া গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষি ও জ্বালানি খাতের আমদানির ধারা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। এছাড়া এটি সাধারণ মানুষের ওপর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্ত্রণালয় মনে করছে।
বর্তমানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় যোগ দিতে ওয়াশিংটনে অবস্থান করায় এ বিষয়ে তাদের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই সফরে আইএমএফের কাছ থেকে অতিরিক্ত ঋণ সহায়তার প্রস্তাব পেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের। উল্লেখ্য যে, ২০২২ সাল থেকে বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তার প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে আশঙ্কাজনক হারে কমে ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। একইসঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার মানে বড় ধরনের অবমূল্যায়ন ঘটায় মূল্যস্ফীতি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়।
অতীতের অর্থনৈতিক সংকটের সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি ও সারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি করেছিল বলে মনে করা হয়। যদিও সে সময় মজুরি সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি, যার ফলে দেশে দারিদ্র্যের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থাকলেও গত বছর তা বেড়ে প্রায় ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি উত্তরণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকেই নতুন বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।