রবিবার, 20 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন: ফজলুর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সংগ্রহশালায় সম্প্রতি জিন্নাহর প্রতিকৃতি অপসারণ ও ভাঙচুরের ঘটনার সূত্র টেনে ফজলুর রহমান বলেন, জিন্নাহর আদি নিবাস ছিল বর্তমান ভারতের গুজরাটে। সেখানে এক মৎস্যজীবী পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর পিতা মাছ বিক্রির পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী ওই পেশায় সম্পৃক্তদের পুঞ্জা উপাধিতে ডাকা হতো।

জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন: ফজলুর রহমান
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর আদি পরিবার গুজরাটের মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তাঁর আদি পরিচয় ছিল জিন্নাহ পুঞ্জা বলে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা আইনজীবী মো. ফজলুর রহমান

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরামের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সংগ্রহশালায় সম্প্রতি জিন্নাহর প্রতিকৃতি অপসারণ ও ভাঙচুরের ঘটনার সূত্র টেনে ফজলুর রহমান বলেন, জিন্নাহর আদি নিবাস ছিল বর্তমান ভারতের গুজরাটে। সেখানে এক মৎস্যজীবী পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর পিতা মাছ বিক্রির পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী ওই পেশায় সম্পৃক্তদের পুঞ্জা উপাধিতে ডাকা হতো। ফলে তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল জিন্নাহ পুঞ্জা এবং পারিবারিকভাবে তাঁরা সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিলেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মাছের ব্যবসার কারণে তৎকালীন সনাতন ধর্মীয় উচ্চবর্ণের মানুষেরা তাঁদের অবজ্ঞার চোখে দেখত। সেই সামাজিক কারণে পরবর্তীকালে তাঁর পরিবার ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাঁর নতুন নাম রাখা হয় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

জিন্নাহর রাজনৈতিক যাত্রার ইতিহাস স্মরণ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, রাজনৈতিক জীবনের সূচনালগ্নে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯১৩ সালের দিকে তিনি মুসলিম লীগে অন্তর্ভুক্ত হন এবং ১৯১৬ সালের ঐতিহাসিক লখনৌ চুক্তির মাধ্যমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

১৯২৯ সালে উপস্থাপিত জিন্নাহর চৌদ্দ দফার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই প্রস্তাবে মূলত মুসলমানদের কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, আলাদা নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের মতো সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবিগুলো সুস্পষ্ট করা হয়েছিল।

পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে বাঙালিদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাঙালিরাও সম্মিলিতভাবে পাকিস্তান বিনির্মাণে অংশ নিয়েছিল, যা কোনো গোপন বিষয় নয়। তবে নতুন রাষ্ট্র গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের শাসন ব্যবস্থার ত্রুটি স্পষ্ট হয়ে উঠলে ১৯৫২ সাল থেকেই অধিকার আদায়ের সংগ্রাম শুরু করতে হয়।

ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাঙালি কোনো একক ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, বরং নৃগোষ্ঠীগত ও ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়তে ব্রতী হয়েছিল।

তিনি উল্লেখ করেন, বায়ান্নর ভাষা সংগ্রামের পর চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্নয় আইয়ুব খানের সামরিক জাঁতাকল, এরপর ঐতিহাসিক ছয় দফা, এগারো দফার গণআন্দোলন এবং সত্তরের নির্বাচনের পথ ধরেই স্বাধীনতার চূড়ান্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।

সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের স্মৃতিচারণ করে ফজলুর রহমান বলেন, ওই নির্বাচনে সারা পাকিস্তানে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তা সত্ত্বেও তৎকালীন শাসক ইয়াহিয়া খান নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা অর্পণ না করায় রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

একাত্তরের রণাঙ্গনে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, তেইশ বছর বয়সে তিনি কেবল অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যাননি, বরং মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করার দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকা অঙ্কনের ঐতিহাসিক রাতে তিনি ঘটনাস্থলে সক্রিয় ছিলেন এবং শিব নারায়ণ দাসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে সার্বিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন।

সংগ্রামের মূল শক্তির তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেন, কেবল আধুনিক অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না; লড়াইয়ের পেছনে থাকা সৈনিক এবং তাঁর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক মতাদর্শই আসল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

জাতীয় পতাকা চূড়ান্ত করা এবং আমার সোনার বাংলা গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারণের ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর কথাও তিনি আলোচনায় তুলে ধরেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেকোনো বিতর্ক সৃষ্টির সমালোচনা করে তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধই এ জাতির সবচেয়ে মৌলিক সত্য এবং মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করলে তা প্রতিটি দেশপ্রেমিকের হৃদয়ে আঘাত হানে।

উপস্থিত তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি আজীবন সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্তত ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়ে হলেও আলোর পথযাত্রী হওয়ার পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচকের বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। নবীনবরণ পর্বের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলফারুন নাহার রুমার সভাপতিত্বে এবং রবীন্দ্র সৃজন কলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মো. নিজাম উদ্দিনের সঞ্চালনায় ওই আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার খন্দকার নাজমুল হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম বেগম, কিশোরগঞ্জ জেলা পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব ও সদস্য সচিব মামুন সরকারসহ অনেকে।