জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ভুয়া পরিসংখ্যান ও তথাকথিত কৃত্রিম পাসের ধারা চিরতরে বন্ধ করে মেধা, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর বৃহৎ রূপরেখা উন্মোচন করেছে সরকার।
এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে পাঠ্যক্রমে এক অভূতপূর্ব ও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই দেশের শিক্ষাক্রমের সাথে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ক্রীড়া বিষয়ক সমসাময়িক নতুন পাঠ্যবিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে।
সম্প্রতি বাসসকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সরকারের ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতি, ব্যাপক কারিকুলাম পরিবর্তন, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, অকৃতকার্যদের মূলধারায় রূপান্তর, শিল্প-শিক্ষা পারষ্পরিক মেলবন্ধন এবং কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র গঠনের সুনির্দিষ্ট কৌশল ব্যাখ্যা করেন।
উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় শিক্ষা খাতকে সরকারের সবচাইতে অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনকালীন প্রতিশ্রুতির আলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের চিন্তাভাবনা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে গতিশীলতা বজায় রাখতে ২০২৭ সালের জন্য ছাপা হতে যাওয়া বইগুলোতে প্রয়োজনীয় সংযোজন ও পরিমার্জন আনার কাজ চলছে, যার চূড়ান্ত রূপ ফুটে উঠবে ২০২৮ সালের সর্বজনীন পাঠ্যক্রমে।
প্রস্তাবিত নতুন পরিবর্তন অনুযায়ী, আগামী বছর থেকেই বিদ্যালয়ের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণিতে নতুন চারটি বিষয় যুক্ত হচ্ছে। যেখানে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করতে ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তিবিদ্যার অংশ হিসেবে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘টেকনিক্যাল এডুকেশন’ স্থান পাচ্ছে। এর মাধ্যমে রোবটিক্স ও এআই-এর মতো প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জ্ঞানের বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলের গুণগত মান প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বিগত আমলে কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়িয়ে দেখানোর যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা বন্ধ করা হয়েছে। কোনো প্রকার বাড়তি কৃত্রিম নম্বর ছাড়া একদম শতভাগ নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে এবার পরীক্ষার্থীদের আসল ও সঠিক ফলাফলের মানদণ্ড নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়া শিক্ষার্থীদের কোনোভাবেই বোঝা মনে না করে তাদের বিষয়ে রাষ্ট্র বিশেষ নজর দিচ্ছে বলে তিনি জানান। পূর্বের ভুল নীতি বদলে এসব পিছিয়ে পড়া তরুণদের বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা ভোকেশনাল কোর্সের আওতায় এনে কর্মক্ষম করে তোলার নীতি প্রস্তুত হচ্ছে, যেখানে উদ্যোক্তা হতে ইচ্ছুকদের জন্য আর্থিক সহায়তার সংস্থানও থাকবে।
একই সাথে দেশের বেকারত্ব নিরসনে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়গুলোতে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ বা চাকরি আদান-প্রদান ব্যবস্থা চালুর কথা জানান তিনি। এই অনলাইন-অফলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় দক্ষ তরুণ-তরুণীদের সাথে বেসরকারি খাত ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যক্ষ নেটওয়ার্ক তৈরি হবে, যা প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সরাসরি অর্থনৈতিক মূলধারায় যুক্ত করবে।
শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ শীর্ষক কর্মসূচির অধীনে পর্যায়ক্রমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের হাতে ট্যাব তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার সার্বিক পরিবেশ তৈরিতে তহবিল বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্প খাতের সাথে মেলবন্ধন ঘটানো এবং প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষকদের দেশে ফিরিয়ে এনে ব্রেন ড্রেন বন্ধের সমন্বিত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন উপদেষ্টা।
গ্রামীণ ও শহরের প্রতিষ্ঠানের ভেদাভেদ নিরসনে জাতীয় পর্যায়ে গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ও নতুন উদ্যোগভিত্তিক স্টার্টআপ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধা সরাসরি জাতীয় স্বীকৃতি পাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। পরিশেষে, শুধু কাগজী সনদে সীমাবদ্ধ না থেকে মেধা, কর্মসংস্থান ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।