কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক অবৈধ হুন্ডি চক্র। এসব সক্রিয় চক্রের হাত ধরে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে পাচার হচ্ছে।
জেলার পাঁচটি উপজেলার সীমান্ত জনপদে ছড়িয়ে থাকা এ নেটওয়ার্ক মাদক ও চোরাই মালামাল আনা-নেওয়ার আর্থিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। চোরাচালানি ও মাদক কারবারিরা তাদের লেনদেনের অর্থ মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে এই অবৈধ পথের ওপর নির্ভর করছে, যার ফলে জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এই চক্রগুলো কেবল সনাতন পথেই সীমাবদ্ধ নেই, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ডিজিটাল মাধ্যমেও লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ছোটখাটো সদস্যরা ধরা পড়লেও চক্রের মূল হোতা ও নেপথ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণ, আদর্শ সদর, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া সীমান্ত দিয়ে মাদক, স্বর্ণ ও অন্যান্য পণ্যের চোরাচালানের দেনা মেটাতে কাজ করছে দুই পারের এজেন্টরা। বৈধ ব্যাংকিং পথ এড়িয়ে অবৈধভাবে মানবপাচারের অর্থ এবং রাজনৈতিক আর্থিক লেনদেনেও এই নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্তরক্ষী ও পুলিশের অভিযানে একাধিকবার নগদ অর্থ ও লেনদেনের রসিদ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মোবাইল ব্যাংকিং সেবার অসদুপব্যবহার করে স্থানীয় কিছু অসাধু এজেন্টের সহায়তায় ডিজিটাল উপায়ে অর্থ স্থানান্তরের এই অপতৎপরতা চলছে। সম্প্রতি আদর্শ সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর সীমান্তে ভারতে অর্থ পাচারের সময় ফোরকান উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে বিজিবি। তার কাছ থেকে নগদ আঠাশ লাখ টাকা ও দুটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়। একই উপজেলার নিশ্চিন্তপুর সীমান্ত এলাকায় রাসেলের দলের এক নারী সদস্যকে নগদ বিশ লাখ টাকাসহ আটক করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এছাড়া গোয়েন্দা পুলিশ ও বিজিবির ধারাবাহিক অভিযানে আরও কয়েকজন সদস্য ধরা পড়েছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, নজরদারি এড়িয়ে অধিকাংশ চক্রই নির্বিঘ্নে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের বিবরণ অনুযায়ী, বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের কণ্ঠনগর গ্রামের আইয়ুব আলীর দল প্রায় দুই দশক ধরে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত। তার সঙ্গে নুরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন কাজ করছেন। বুড়িচং বাজারে নিত্যপণ্যের ব্যবসার আড়ালে ভাগিনা মনির নামের এক ব্যক্তি বড় দল নিয়ে এই কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এছাড়া খারেরা এলাকায় রফিজ মেম্বার, হানু মিয়া ও গাজীর পৃথক দল অর্থ লেনদেনে সক্রিয় রয়েছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বাগড়া বাজারে কবির খাঁন এবং শশীদল বাজারে ইউসুফ, আনোয়ার ও উজ্জ্বলের দল এই অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছে।
আদর্শ সদর উপজেলার গোলাবাড়ী এলাকায় মনির, জাকির ও শেকুলের দল এবং নিশ্চিন্তপুরে রাসেল ও জাভেদের চক্র ভারতে অর্থ পাচারে যুক্ত। একই সঙ্গে সদর দক্ষিণের বলেরডেপা এলাকার হানিফ, দলকিয়ার মফিজ, মথুরাপুরের মিজান, কমলপুরের সাইফুল এবং রাজেশপুরের রুবেল ও কালার দল তৎপর রয়েছে।
চৌদ্দগ্রামের চরলক্ষ্মীপুর এলাকার পেয়ার আহমেদ, চিওড়ার লিটন এবং ঘোলপাশার সুজন চক্র মাদক কারবারের পাশাপাশি হুন্ডির বিস্তার ঘটিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রতিটি চক্রের অধীনে কুড়ি থেকে ত্রিশ জন বহনকারী কাজ করেন, যারা মাঠপর্যায় থেকে চোরাকারবারিদের টাকা সংগ্রহ ও পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সামলান।
কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ জানান, চোরাচালান ও মাদক কারবারিদের পাশাপাশি হুন্ডি চক্রের বিরুদ্ধেও নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে তারা অত্যন্ত সতর্ক ও নতুন কৌশল ব্যবহার করায় ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা বেশ জটিল হয়ে পড়ে।
কুমিল্লা ১০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ জানান, সম্প্রতি অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং এসব চক্রকে প্রতিহত করতে সীমান্তজুড়ে গোয়েন্দা তৎপরতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।