মাত্র পাঁচ মিনিট। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করা আর হৃদয়ভাঙা বিদায়ের মধ্যে ব্যবধান ছিল এতটুকুই। ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত দুই গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামের নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের কাছে হার মেনে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে সেনেগালকে।
বুধবার রাতে সিয়াটলে অনুষ্ঠিত ম্যাচের অধিকাংশ সময়ই ছিল আফ্রিকার দলটির নিয়ন্ত্রণে। গোছানো ফুটবল, দ্রুতগতির আক্রমণ এবং ধারাবাহিক চাপের মাধ্যমে বেলজিয়ামকে কোণঠাসা করে রেখেছিল ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গা’। হাবিব দিয়ারা ও ইসমাইলা সারের গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তারা। তখন বেলজিয়ামের বিদায় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল।
কিন্তু ফুটবলের অনিশ্চয়তাই শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় পুরো চিত্র।
ম্যাচের ৮৫তম মিনিটে রোমেলু লুকাকুর গোল বেলজিয়ামকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। এরপর মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে অধিনায়ক ইউরি টিলেমান্স সমতা ফেরালে ম্যাচে নতুন প্রাণ ফিরে পায় ‘রেড ডেভিলস’। অন্যদিকে হঠাৎ করেই ছন্দ হারিয়ে ফেলে সেনেগাল।
নাটকীয়তা থেমে থাকেনি সেখানেই।
অতিরিক্ত সময়ে দীর্ঘ ভিএআর পর্যালোচনার পর রেফারি সিদ্ধান্ত দেন, লামিন কামারা ফাউল করেছেন ইউরি টিলেমান্সকে। সেই সিদ্ধান্তে বেলজিয়াম পেনাল্টি পায়। সিদ্ধান্তটি ঘিরে সেনেগালের খেলোয়াড়রা তীব্র প্রতিবাদ জানালেও রেফারি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
স্পটকিক থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন টিলেমান্স। তাতেই ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য জয় তুলে নিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে বেলজিয়াম।
ম্যাচ শেষে হতাশা প্রকাশ করে সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও বলেন, "ফুটবল একটি নিষ্ঠুর খেলা,"
চলতি বিশ্বকাপে এমনিতেই মানসিক চাপ নিয়ে মাঠে নেমেছিল সেনেগাল। বছরের শুরুতে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে বিতর্কিত এক পেনাল্টির কারণে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে যায় তাদের। সিয়াটলের এই ম্যাচ যেন সেই তিক্ত স্মৃতিকেই আবারও সামনে এনে দিল।
নির্ণায়ক পেনাল্টি প্রসঙ্গে থিয়াও বলেন, "আমাদের বিশ্বাস ছিল, এটি কোনো পেনাল্টি ছিল না। খেলোয়াড়রা সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে। সেটা তাদের অধিকার।"
তবে বিতর্ক থাকলেও বাস্তবতা হলো, শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট, ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর ম্যাচটি জয়ের মতো অবস্থানেই ছিল সেনেগাল। কিন্তু শেষ মুহূর্তের চাপ সামলাতে পারেনি তারা।
ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে থিয়াও আরও বলেন, "একটি ফুটবল ম্যাচ ৮৫ মিনিটের নয়।"
তার এই মন্তব্যই যেন পুরো ম্যাচের সারাংশ। শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে দীর্ঘ সময় ভালো খেলাই যথেষ্ট নয়; শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস ও শৃঙ্খলা ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে বেলজিয়ামের ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কোচ রুডি গার্সিয়া। সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে রোমেলু লুকাকুকে মাঠে নামানোর পাশাপাশি আক্রমণভাগে কৌশলগত পরিবর্তন আনেন তিনি। সেই পরিবর্তনের পরই বাড়তে থাকে বেলজিয়ামের আক্রমণের তীব্রতা এবং ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়।
অতিরিক্ত সময়ের লড়াই নিয়ে গার্সিয়া বলেন, "এটা যেন দুই বক্সারের লড়াই। আমরা শুধু লড়াই করেই গেছি।"
শেষ পর্যন্ত সেই লড়াইয়ের মানসিকতাই জয় এনে দেয় বেলজিয়ামকে।
অন্যদিকে এই পরাজয় দীর্ঘদিন তাড়া করবে সেনেগালকে। ডিফেন্ডার ক্রেপিন দিয়াত্তা জানিয়েছেন, তারা সেনেগালের ফুটবল ইতিহাসে “সুন্দর কিছু অধ্যায়” লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাতের নাগালে এসেও শেষ পর্যন্ত অধরা থেকে গেল সেই স্বপ্ন।
এই ম্যাচ আবারও মনে করিয়ে দিল, ফুটবল সব সময় সেরা খেলাটাই পুরস্কৃত করে না। কখনো কখনো কয়েক মিনিটের দুর্বলতা কিংবা একটি সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে পুরো ইতিহাস।
সেনেগাল যেখানে শেষ ষোলোর উৎসব থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট দূরে ছিল, সেখানে বেলজিয়ামও ছিল বিদায়ের কিনারায়। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজতেই বদলে যায় সব হিসাব। শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে এগিয়ে যায় ‘রেড ডেভিলস’, আর ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গা’কে মাঠ ছাড়তে হয় একরাশ আক্ষেপ নিয়ে।
ফুটবল যেমন আনন্দ, আবেগ ও সৌন্দর্যের প্রতীক, তেমনি এমন রাতগুলো প্রমাণ করে—গৌরব আর হতাশার দূরত্ব কখনো কখনো মাত্র কয়েক মিনিটের। আর সে কারণেই, পাপে থিয়াওয়ের ভাষায়, "ফুটবল একটি নিষ্ঠুর খেলা"।