রবিবার, 20 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

মঙ্গলবার থেকে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে: প্রধানমন্ত্রী

প্রায় তিন ঘণ্টার মতবিনিময় সভায় জ্বালানি সংকট, তা উত্তরণে নেওয়া পদক্ষেপ, সরকারের ঘোষিত ১০ বছর মেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা এবং করণীয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সংকট উত্তরণে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

মঙ্গলবার থেকে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে: প্রধানমন্ত্রী

শিল্প-কলকারখানায় আগামীকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে আগের মতো গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে সরকারের ‘জ্বালানি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপুল এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, “দেশে অস্থিতিশীলতা না করে সরকার তার মেয়াদে যাতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পায় সেজন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।”

ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “আমাদের সহযোগিতা করবেন যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

প্রায় তিন ঘণ্টার মতবিনিময় সভায় জ্বালানি সংকট, তা উত্তরণে নেওয়া পদক্ষেপ, সরকারের ঘোষিত ১০ বছর মেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা এবং করণীয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সংকট উত্তরণে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

উপপ্রেস সচিব হাসান শিপুল বলেন, “ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মতামত প্রধানমন্ত্রী আগ্রহ নিয়ে শুনেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা। এ সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সমস্যা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।”

দেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা আশা করছি, ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগে যে অবস্থায় ছিল, সে রকম একটা অবস্থায় ফিরে আসবে।”

ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও মতবিনিময় সভায় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে উপপ্রেস সচিব শিপুল বলেন, “জিটুজি ভিত্তিতে গত এক মাসে আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন করা হয়েছে। দ্রুতই এর কাজ শুরু হবে।”

২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালকে সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা দীর্ঘদিনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সমস্যা পর্যালোচনা করেছে, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছে এবং সেগুলো সমাধানে পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।”

সরকার এসব কাজ কখন শেষ করতে চায়, তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। এ বিষয়ে উপপ্রেস সচিব শিপুল বলেন, “সরকার এই কাজ কখন শেষ করতে চায়, তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।”

‘ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব ব্যাপক’

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়ে। এ বিষয়ে উপপ্রেস সচিব বলেন, “ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত।”

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়েছে।

বর্তমান সমস্যার ব্যপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আগে থেকেই অবগত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার সমস্যাগুলো আড়াল না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে এবং কীভাবে সেগুলোর সমাধান করতে চায়, সেটিও জানিয়েছে। তিনি বলেন, “এতটুকু আমরা আপনাদের জানাতে চেয়েছি যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সেজন্য হতাশ হওয়ার মতো কারণ নেই।

সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নয়, পুরো দেশ উপকৃত হবে।”

দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণই সময়মতো ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যেসময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজগুলো সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত।

‘গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান’

মতবিনিময় সভায় সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণও ব্যাখ্যা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছেও সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে আমি মনে করি।”

বড় কোনো কাজ সফলভাবে করতে হলে একটি কার্যকর দল প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।

সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক এবং বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম অংশ নেন।

সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক মোস্তাফা ফিরোজ, আকবর হোসেন, শাহেদ আলম, রেজাউল করিম রনি, আজিজুর রহমান রিপন ও তরিকুল ইসলাম সৌরভ। এ ছাড়া গণমাধ্যম ব্যক্তি আব্দুন নূর তুষার এবং টিভি অনুষ্ঠানের আলোচক আশরাফ কায়সার উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহরিন ইসলাম খান, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এবং জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন।