কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুরি ইউনিয়নে কালজানি নদীর ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত তিন দিনে ইউনিয়নের উত্তর ঢলডাঙ্গা ও কাজিয়ার চর গ্রামের প্রায় ৮০টি বসতবাড়ি, বিপুল পরিমাণ আবাদী জমি এবং প্রচুর গাছপালা নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।
এছাড়া নদী তীরবর্তী আরও পঞ্চাশের বেশি পরিবার বর্তমানে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙনের হাত থেকে বাঁচতে অনেক পরিবারকে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্র থেকে জানা যায়, ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা ঢল এবং গত কয়েক দিনের একটানা বর্ষণের ফলে কালজানি নদীর পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা এই ভাঙনের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে বেশ কিছু পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে অত্যন্ত কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যে দিনাতিপাত করছে।
ক্ষতিগ্রস্ত উত্তর ঢলডাঙ্গা এলাকার তোফাজ্জল মিয়া নামের এক মাঝবয়সী ব্যক্তি জানান, অতীতেও তিনি একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে সবকিছু হারিয়েছেন। অনেক কষ্টে নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করলেও তা আবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। এবার আশ্রয় হারালে পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন, তা নিয়ে তিনি গভীর দুশ্চিন্তায় আছেন। একই গ্রামের আমেনা বেগম নামের এক নারী আক্ষেপ করে বলেন, নদী তাঁর শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে, ফলে এই মুহূর্তে পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন তা বুঝতে পারছেন না। এছাড়া শাহা আলম নামের আরেক বাসিন্দা জানান, দিন-রাত এক করে তিনি ঘর সরানোর কাজ করছেন কারণ কখন নদী তাঁর ঘর গ্রাস করে নেয় সেই আতঙ্কে আছেন তিনি।
কাজিয়ার চর এলাকার বাসিন্দা মোজাফ্ফর আলী নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, নদী প্রথমে তাঁর চাষের জমি গিলে খেয়েছে এবং এখন ভিটেমাটি কেড়ে নিচ্ছে। প্রতি বছর এভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে তিনি সরকারের কাছে একটি স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানান।
শিলখুরি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন ইউসুফ এই বিষয়ে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত। গত কয়েক দিনের ভাঙনে সেখানে ৭০ থেকে ৮০টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং আরও বহু পরিবার গৃহহীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দ্রুত সরকারি সহায়তা ও ভাঙন রোধে কাজ শুরু না হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, তাঁরা বর্তমান ভাঙন পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্রুত জরুরি সুরক্ষামূলক কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। দীর্ঘকাল ধরে কালজানি নদীর এই ভাঙন সমস্যা চলে আসলেও এখনো পর্যন্ত কোনো স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলশ্রুতিতে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই এই অঞ্চলের মানুষকে চরম আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উত্তর ঢলডাঙ্গা ও কাজিয়ার চর এলাকাকে সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে স্থানীয় জনগণ সরকারের উচ্চপর্যায়ের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।