দীর্ঘ প্রস্তুতি, নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম আর অটুট ধৈর্যের পরীক্ষার নাম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)। সেই কঠিন পথ পেরিয়ে এবার নতুন এক মাইলফলক গড়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ। বিভাগের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে দুই শিক্ষার্থী বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
সফল দুই শিক্ষার্থী হলেন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের পাপ্পু সরকার এবং ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের আজগর আলী শামীম। আলাদা সময়ে প্রস্তুতি নিলেও তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—বিসিএস ক্যাডার হওয়া। দীর্ঘ অপেক্ষা, ব্যর্থতা এবং নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তারা পৌঁছেছেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে। তাদের অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্যের এক অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত। এই দুই শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প শুনেছেন দ্যা ভয়েস ২৪-এর কুবি প্রতিনিধি মনির আহমদ শিহাব।
নিজের অনুভূতি জানিয়ে আজগর আলী শামীম বলেন, ' পিএসসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফলে নিজের রেজিস্ট্রেশন নম্বর কাঙ্ক্ষিত পদের পাশে দেখে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কয়েকবার মিলিয়ে দেখার পর বিশ্বাস করতে পেরেছি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অনিদ্রার রাত ও মানসিক চাপের অবসান ঘটেছিল সেই মুহূর্তে। এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার আম্মু। তাঁর নিঃশর্ত আস্থা, সাহস এবং পরিবারের সবার সমর্থনই আমাকে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে।'
প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিকে বিসিএস প্রস্তুতি গুছিয়ে শুরু করি। প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়েছি, তার চেয়ে নিয়মিত পড়ার অভ্যাসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। শুধু মুখস্থ নয়, প্রতিটি বিষয়ের মৌলিক ধারণা পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছি।'
বিসিএস প্রস্তুতির সবচেয়ে কঠিন দিক সম্পর্কে তিনি বলেন, ' বিসিএস যাত্রার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা, একঘেয়েমি ও হতাশা। মন খারাপ হলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতাম, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আবার নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় ফিরতাম। নিজেকে সবসময় মনে করাতাম কষ্টের রাত যত দীর্ঘই হোক, সকাল আসবেই।'
প্রস্তুতির কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'প্রিলিমিনারিতে বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পড়তাম এবং নিয়মিত মডেল টেস্ট দিতাম। লিখিত পরীক্ষায় তথ্যের পাশাপাশি চার্ট, ম্যাপ ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে উত্তর সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। ভাইভায় আত্মবিশ্বাস, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান এবং সমসাময়িক দেশ-বিদেশের বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছি।'
অনুজদের উদ্দেশে আজগর আলী শামীম বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে টিউশন ও কোচিং করিয়েছি, যা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পাশাপাশি চাকরির প্রস্তুতিতেও সহায়ক হয়েছে। তবে অতিরিক্ত টিউশন না করে ২-৩টি টিউশন করার পরামর্শ দেব। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখলে পড়ার ধরন বদলাতে হবে। ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা, বেসিক শক্ত করা এবং ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখাই সফলতার মূল চাবিকাঠি। বিসিএস একটি ম্যারাথন; এখানে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।'
অন্যদিকে পাপ্পু সরকার নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, 'ফল প্রকাশের পর মনে হয়েছিল, এবার সত্যিকার অর্থেই নিজের পছন্দের পেশায় কাজ করার সুযোগ পেলাম। আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে বাবা। তৃতীয় বর্ষের শেষ থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছিলাম, তবে বিবিএ শেষ করার পর পূর্ণাঙ্গভাবে প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিই।'
তিনি আরও বলেন, 'পিওর কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে বিসিএসের বিস্তৃত সিলেবাসের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রক্রিয়া ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, প্রিলিমিনারির প্রস্তুতি ভালো হলে লিখিত ও ভাইভার ভিত্তিও অনেকটাই তৈরি হয়ে যায়। একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি নন -একাডেমিক বই পড়া, ভালো বন্ধুদের সঙ্গে থাকা এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনও সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।'
বিসিএসে অংশ নিতে আগ্রহীদের উদ্দেশে পাপ্পু সরকার বলেন, 'প্রথমে বিসিএসের সিলেবাস ভালোভাবে বুঝতে হবে। পরিশ্রমী হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শুধু মুখস্থ নয়, জানার জন্য পড়তে হবে।"
তিনি জানান, তিনি শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষা খাতে ইতিবাচক অবদান রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।