পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগের মধ্যেই তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিএনপি নেতাদের দলীয় পদ পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয় প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি), গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পাওয়া নেতাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এসব বার্তা কোনো সাংবিধানিক বা রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগের জন্য নয়; বরং বিএনপির দলীয় পদ পাওয়ার পর তাদের উদ্দেশে দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্যাডের পাশাপাশি জনসংযোগ দপ্তরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও এসব অভিনন্দন বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে।
শিক্ষক সংগঠনগুলোর নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট তিন উপাচার্যই অতীতে বিএনপি সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন।
বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন শিক্ষাবিদ মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগব্যবস্থায় এ ধরনের রাজনৈতিক বার্তা প্রকাশ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে দলীয় প্রভাবের প্রশ্ন তৈরি করে। তাদের ভাষ্য, একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মত প্রকাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা সমীচীন নয়।
উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৬ মার্চ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে মার্চে সাতটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। বিএনপির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং বিএনপি সমর্থিত সংগঠনগুলোর নথি অনুযায়ী, এই আটজনের প্রত্যেকেরই দল-সমর্থিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। তাদের কয়েকজনের দলীয় পদও ছিল।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়। অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য অধ্যাপক মামুন আহমেদকে ইউজিসির চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমানকে কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়েছে। রাবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি জিয়া পরিষদের সভাপতি এবং জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের উপদেষ্টা ছিলেন।
তখন এসব নিয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন প্রশ্ন তুলেছিলেন, 'কোনো ব্যক্তির রাজনীতিতে যুক্ত থাকা কি অপরাধ?'
তিনি আরও বলেন, 'যাদের মনোনীত করা হয়েছে তাদের গবেষণা, প্রকাশনা, সাইটেশন ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।'
এরপর ১৪ মে বিএনপি সরকার ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে পরিবর্তন আনে। শিক্ষকদের সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, তাদের অন্তত ১০ জনের বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদগুলোতে এসব পরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি অভিযোগ করে, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার তুলনায় দলীয় আনুগত্য এবং রাজনৈতিক বিবেচনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আগের সরকারগুলো নিয়েও একই অভিযোগ
শুধু বর্তমান সরকার নয়, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধানে উঠে আসে, অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া ৪৭ জন উপাচার্যের মধ্যে অন্তত ৩০ জন বিএনপি অথবা জামায়াত সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একইভাবে ৪০ জন উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের মধ্যে ১৮ জনেরও এমন সম্পৃক্ততা ছিল।
পরবর্তী সময়ে সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্বীকার করেন, কয়েকটি নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের 'মৃদু' বা 'নিষ্ক্রিয়' বিএনপি-সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
তিনি তখন জানিয়েছিলেন, উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে তিনি বিএনপির এক শীর্ষ নেতার কাছে সুপারিশ চেয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যক্তিদের বিবেচনার বাইরে রেখেছিলেন।
এরও আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। ২০২২ সালে দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৪৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মধ্যে ৩৯ জনই সরকার সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের কোনো না কোনো পদে ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও আওয়ামী লীগ সমর্থিত নীল দলের সঙ্গে যুক্ত ১২ জন শিক্ষক পরবর্তী সময়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পান।
তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রচারেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের নজির রয়েছে। ২০২২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়। ২০২১ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার (বর্তমানে ভারতে পলাতক) জন্মদিন উদযাপন করে।
এ ছাড়া ২০১৯ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে বিএনপি নেতাদের শুভেচ্ছা
গত ২০ আগস্ট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পর রুহুল কবির রিজভীকে অভিনন্দন জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। জাবির জনসংযোগ অফিসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বার্তাটি প্রকাশ করা হয়।
অভিনন্দনের পাশাপাশি রিজভীর 'নতুন দায়িত্বে সফলতা' কামনা করেন কামরুল। তার নেতৃত্বে বিএনপি আরও এগিয়ে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। কামরুল এর আগে জাবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি ছিলেন।
দ্য ডেইলি স্টারকে অধ্যাপক কামরুল জানান, বার্তাটি ফেসবুকে প্রকাশের সময় তিনি ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলেন। পরে বিষয়টি তার নজরে এলে তিনি সেটি সরিয়ে দেন।
২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি বলেন, 'ব্যক্তিগত অভিনন্দন বার্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম থেকে আলাদা রাখা উচিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনে চলা উচিত,'
অন্যদিকে, ১৭ আগস্ট গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. নাজমুস সাদাত বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া চার নেতাকে অভিনন্দন জানান।
বার্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বিএনপি নেতাদের শুভেচ্ছা জানানো হয়। তাদের অভিজ্ঞতা নতুন দায়িত্ব পালনে বিশেষ সহায়ক হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
নথি অনুযায়ী, ১৯ জুলাই গোবিপ্রবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন সাদাত। এর আগে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
পরে ২৫ আগস্ট তাকে গোবিপ্রবির উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়।
টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফোনালাপের তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দপ্তর থেকে কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ পদায়নে অভিনন্দন জানানো উচিত কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, 'আমি মানুষ। আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে।'
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমও বিএনপি নেতা ফরহাদ হালিম ডোনারকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ায় অভিনন্দন জানান।
এ ক্ষেত্রে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্যাড ব্যবহার করেন। বিএনপি সমর্থিত একটি শিক্ষক সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন রেজাউল। বার্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ফরহাদ হালিমকে অভিনন্দন জানানো হয়।
২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান রেজাউল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাড ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাকে অভিনন্দন জানানোর বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব দেননি।
'প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার লঙ্ঘন'
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে 'প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার লঙ্ঘন' বলে মনে করেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন অভিনন্দন বার্তা দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, 'উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা নতুন কিছু নয় এবং এটি পাকিস্তান আমল থেকেই চলছে। তবে আগে এগুলো এত স্পষ্ট বা প্রত্যক্ষ ছিল না।'
তিনি আরও বলেন, 'সমস্যা তখনই দেখা দেয় যখন কোনো দ্বিধাবোধ ছাড়াই এগুলো প্রকাশ্যে করা হয়,'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মো. তানজীমউদ্দীন খান মনে করেন, বিষয়টির সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ধরে রাখা এবং 'তোষামোদের' সম্পর্ক রয়েছে।
ইউজিসির সাবেক এই সদস্য প্রশ্ন তোলেন, 'ওই দলের সঙ্গে যুক্ত কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী অপরাধ করলে উপাচার্য কি ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারবেন?'
তিনি বলেন, 'আমরা আশা করি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদায়ন, নিয়োগ বা অন্য কোথাও চরম দলীয় আচরণ থাকবে না। তবে ঘটনাগুলো দেখে মনে হচ্ছে সব আবার পুরোনো পথেই ফিরে যাচ্ছে,'