মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ব্যাংক খাতের গভীর সংকট, আইএমএফের সঙ্গে অনিশ্চিত আলোচনা—এমন এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় এটাই তার প্রথম বাজেট।
বাংলাদেশে প্রতি বছরের জুন মাসেই জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজেটের আকারও বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেট বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। প্রায় দুই দশক পর বিএনপি সরকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের দায়িত্ব পেয়েছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন, ঘাটতি মোকাবিলা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের পুরো দায়ভার এখন তাদের কাঁধে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এবার তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তার নেতৃত্বাধীন সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। আর ২০০৬ সালে বিএনপির শেষ বাজেটের তুলনায় এর আকার প্রায় ১৩ গুণ।
তবে অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশের কর আদায়ের হার এখনও জিডিপির প্রায় ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা ভারত, ভিয়েতনামসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অথচ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর মতো রাজস্ব কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবুও সরকার আগের মতোই রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ, ঋণের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আশাবাদী পূর্বাভাসের পথেই এগোচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতির অন্যতম বড় প্রয়োজন এখন বিনিয়োগ বৃদ্ধি। কিন্তু প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশীয় ব্যাংক ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, বহুপাক্ষিক ঋণ সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ চুক্তিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি কিস্তি ছাড় হলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তি স্থগিত করে সংস্থাটি। তাদের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করা।
বর্তমানে সরকার নতুন একটি ঋণ কর্মসূচির জন্য আবেদন করেছে এবং এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আইএমএফ প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরের অপেক্ষা করছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিক রূপান্তর’-এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার মতে, শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, গ্রামীণ নারী, কামার, কুমার, তাঁতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অবদানও জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এজন্য নতুন বাজেটে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া তিনি সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন অনুমোদনের জন্য একক কেন্দ্র গঠন করা হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাড়া না দিলে আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে।
নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রেও চারটি মানদণ্ড নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে—ব্যয়ের যৌক্তিকতা, বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব। এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ প্রকল্প বাতিল করা হতে পারে।
তবে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে এখনও রয়ে গেছে ব্যাংক খাত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। পাঁচটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে একদিকে অর্থমন্ত্রী ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বিকল্প হিসেবে বন্ডবাজার শক্তিশালী করতে চান, অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতেও তাকে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে সংস্কার ও অর্থসংস্থানের মধ্যে একটি জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে তাকে।
এরই মধ্যে নতুন সরকারকে আরেকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়তে হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এর ফলে তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে যায় এবং মার্চ থেকে জুনের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রীর হিসাব।
সব মিলিয়ে এবারের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং নতুন সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। কর আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংক সংস্কার, বিনিয়োগ বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম কার্যকর করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই বাস্তব অগ্রগতি দেখানোর চাপ রয়েছে সরকারের ওপর।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেট বক্তৃতার বড় বড় সংখ্যা নয়, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই হবে সরকারের সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।