'সে যখন বলল, ভাইসব/ অমনি অরণ্যের এলােমেলাে গাছেরাও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল/ সে যখন ডাকলো, ভাইয়েরা আমার/ ভেঙে যাওয়া পাখির ঝাক ভীড় করে নেমে এল পৃথিবীর ডাঙায়/ কবিরা কলম ও বন্দুকের পার্থক্য ভুলে হাঁটতে লাগলাে
খােলা ময়দানে।'
রেসকোর্স ময়দানের বিখ্যাত সেই ভাষণ সম্পর্কে আল মাহমুদ এভাবেই নিজের অনুভুতির স্মৃতিচারণ করেছেন 'নিশিডাক' কবিতায়। তিনি লিখেছেন-
'দেখি, আমার হাতের তালু ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে
এক আগুনের জিহবা।
বলাে, তােমার জন্যই কি আমরা হাতে নিইনি আগুন?
নদীগুলােকে ফণা ধরতে শেখায়নি কি তােমার জন্য-
শুধু তােমারই জন্য গাছে গাছে ফুলের বদলে ফুটিয়েছিলাম ফুলকি।'
আজ সেই 'ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চ' দিবস। ৫৫ বছর পর বিমুখ সমাজ আর রাষ্ট্রীয় বুহ্যের ভিতর বসে মনেহয়, অতিরঞ্জিত উপমায় লেখা কবিতাটি হয়তো কবি প্রকৃত আবেগের চেয়ে নিপুণ অলংকরণেই এঁকেছেন।
কিন্তু শত বছরের সঞ্চিত আত্মপরিচয়, স্বীকৃতি আর শোষণ মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা- সেই উদ্যত তর্জনীর আলোড়নে আরও তীব্র আকার নিয়েছে কিশোর-যুবকসহ সকল শ্রেণির চেতনায়; সেই বোধ, সেই স্বপ্নের বিভোরতা, শীতল রক্তপ্রবাহে সঞ্চারিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো সেই দ্রোহের পঙক্তি- 'রক্ত দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ! এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম'-
ষাটের দশকের উত্তাল মুহুর্তগুলোয় বাঙালির কাছে কোনো শাব্দিক অলংকরণ-উপমার চেয়ে আরও গভীর, আরও নিপুণ কালোত্তীর্ণ কবিতা হয়ে উঠেছে এই পঙক্তিগুলো। এ এমন এক যুগসন্ধির কোলে সৃষ্ট শিল্প, যা মানুষকে নিয়ে গেছে যুদ্ধের মাঠে, অভ্যুদয় ঘটিয়েছে একটি স্বাধীন দেশের।
নির্মলেন্দু গুণ 'স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো' কবিতায় ৭ই মার্চের সেই মুহুর্তকে চিত্রায়িত করেছেন এভাবে-
'শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি'
শত বছরের শত সংগ্রাম তখনো শেষ হয়নি, শতাব্দী থেকে শতাব্দী বয়ে চলা বাঙালির লড়াই-সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এ বছরের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেসকোর্স ময়দানের(বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সেই রক্তধারায় শিহরণ জাগানো ভাষণ সৃষ্টি করেছে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রথম পর্ব।
স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রভাব এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিবেচনা করে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর এই ভাষণকে 'বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি মিললেও স্বাধীন দেশে দীর্ঘ সময় নিষিদ্ধ ছিল বাঙালির এই কালোত্তীর্ণ মহাকাব্য। ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আদর্শিক সংঘাতের বাহানায় একেক শাসকের ইতিহাস দখলের অপচেষ্টা ছিল শেখ মুজিবকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার। জনতার নেতা থেকে তিনি রাষ্ট্রনেতা হয়েছিলেন, এ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বই তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে জনগণের কাছ থেকে।
সপরিবারে তাঁকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ২০২৫ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় এবং অভ্যুত্থানের পর কয়েকবার হামলা চালিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ করা হয় ধানমন্ডি-৩২ এ অবস্থিত তাঁর বাড়ি। পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়া হয় শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণ। তাকে মুছে ফেলার কৌশলী বিভিন্ন পদক্ষেপ চলমান। কিন্তু যে দেশের নামের সাথে, জন্মের সাথে, ইতিহাসের পরতে পরতে তিনি জড়িয়ে আছেন- সেই বাংলাদেশ থেকে তাকে মুছে ফেলা সম্ভব?
পাকিস্তানের ফাঁসির মঞ্চ থেকে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি নিজ জন্মভূমিতে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। দেশে ফিরেই তিনি বাংলাদেশের জনগণের মুখোমুখি হন, যে জনগণ অধীর অপেক্ষায় দিন গুনছিল তাঁর প্রত্যাবর্তনের।
অশ্রুসিক্ত শেখ মুজিব মঞ্চে উঠেই বাঙালির পরিচিত এবং প্রিয় সেই দরাজ আবেগঘন কন্ঠে বললেন, আজ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে।
বক্তব্যে তিনি রবীন্দ্রনাথের বঙ্গমাতা কবিতার শেষ দুটি লাইন উল্লেখ করে বলেন, 'কবিগুরু বলেছিলেন-
'সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।'
কবিগুরুর মিথ্যা কথা প্রমান হয়ে গেছে, আমার বাঙালি আজ মানুষ।'
বাঙালিকে নিয়ে গর্ব করা শেখ মুজিব স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৩ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সপরিবারে নিহত হন বাঙালির হাতেই। পাঠ্যপুস্তক থেকে শেখ মুজিব সম্পর্কিত অধ্যায় বাতিল করেছে বাঙালি। তাঁর ইতিহাস, প্রচারণা নিষিদ্ধ হয় বাঙালির হাতেই। এখনো তাকে জারজ সন্তান বলে অপপ্রচার করে কিছু বাঙালিই, তাঁর বাড়ি স্বাধীনতা আন্দোলনের আঁতুরঘর ধানমন্ডি-৩২ চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে বাঙালি।
জীবনের ওপারে হয়তো রবীন্দ্রনাথ মুচকি হেসে বঙ্গবন্ধুকে বলছেন, বাঙালি মানুষ হয়নি, আমি কি মিথ্যা বলেছি, মুজিব? তখনো বঙ্গবন্ধুর জবাব- 'আমার বাঙালি আমাকে হত্যা করতে পারে না। আমাকে হত্যা করেনি।'







