এক নিভৃতচারী সুরের কারিগর: আইনাস তাজওয়ার হক ও তাঁর ‘আইনাস মহল্লা’
এক নিভৃতচারী সুরের কারিগর: আইনাস তাজওয়ার হক ও তাঁর ‘আইনাস মহল্লা’
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশকাল: ১৪ মে ২০২৬, ০১:৩০ পি.এম
বাংলা ব্যান্ডের পরিচিত ধারার বাইরেও এমন কিছু স্রষ্টা থাকেন, যাঁরা নিভৃতে বুনে চলেন শব্দের এক মায়াবী জাল। তাঁরা আলোচনার কেন্দ্রে না থেকেও ধীরে ধীরে নিজস্ব শিল্প শৈলী দিয়ে তৈরি করেন ভিন্ন এক সুরের জগৎ, স্বকীয় এক ভাষার পৃথিবী। সেই ভাষা কখনও গিটারের ঝংকারে তীব্র, কখনও বা ভাঙা ছন্দের দোলায় কম্পিত, আবার কখনও গভীর নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। সমসাময়িক বাংলা ‘আর্ট রক’ বা শিল্পনির্ভর সংগীতের তেমনই এক নিভৃত কারিগর আইনাস তাজওয়ার হক।
শব্দের স্থাপত্য ও এক অন্য ভুবন
আইনাসকে কেবল একজন সুরকার বা গিটারবাদক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলে তাঁর সৃজনশীলতার পূর্ণ রূপটি অস্পষ্ট থেকে যাবে। তিনি একাধারে গীতিকার, শব্দ প্রকৌশলী, আবহ সংগীত নির্মাতা এবং শব্দ পরিকল্পক। তাঁর কাছে শব্দ মানে কেবল কিছু সুরের সমষ্টি নয়; বরং শব্দ হলো একটি ‘আবহ’ বা ‘স্থান’। এই ভিন্নধর্মী দর্শন থেকেই জন্ম নিয়েছে তাঁর বিশেষ প্রকল্প— ‘আইনাস মহল্লা’।
শুধু গান নয়, বিচিত্র সুরের পৃথিবী
‘আইনাস মহল্লা’কে গতানুগতিক কোনো গানের দল বলা চলে না। এটি যেন শব্দের এক বিশাল মহাবিশ্ব, যেখানে প্রতিটি সুর একটি নির্জন গলি, প্রতিটি কথা একটি পুরনো ঘর কিংবা কোনো জরাজীর্ণ বারান্দার প্রতিধ্বনি। এই ‘মহল্লা’র ধারণার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আইনাসের জীবনদর্শন। নাগরিক ক্লান্তি, বিচ্ছেদের হাহাকার, একাকীত্ব, স্মৃতি এবং আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অনন্য আবেগীয় ভূগোল। তাঁর সৃষ্টি শুনতে শুনতে শ্রোতা কেবল সুরের গহিনেই হারান না, বরং এক বিশেষ পরিবেশের ভেতর প্রবেশ করেন।
‘পাখি’, ‘ঘুড়ি’, ‘লাল কালিতে’, ‘তুমি কেমন আছ’, ‘শূন্যতা’, ‘শামানের হাত’, ‘লিলুয়া হাওয়া’ কিংবা অতি সাম্প্রতিক ‘তরবিয়াত’— প্রতিটি কাজ আলাদা হলেও তারা একত্রে একটি মহাকাব্যিক মানচিত্র তৈরি করে। আর্ট রকের আঙিনায় ব্যক্তিগত পঙক্তিমালা
বাংলা সংগীতে ‘আর্ট রক’ বা শিল্পঘেঁষা সংগীতের চর্চা আজও বেশ সীমিত। এই ধারায় গানের প্রচলিত ছক বা কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। কখনও সুরের চেয়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অধিক গুরুত্ব পায়। আইনাসের কাজেও সেই সাহসী পরীক্ষা-নিরীক্ষা স্পষ্ট। তাঁর সংগীতের বিশেষত্ব হলো গিটারের বিভিন্ন স্তরের বুনন, পারিপার্শ্বিক শব্দের কারুকাজ, অসম ছন্দ এবং কৃত্রিমতাহীন কণ্ঠস্বর। তাঁর গানগুলো কোনো ‘পণ্য’ নয়, বরং মানুষের অকৃত্রিম অনুভূতির প্রতিচ্ছবি। সেখানে গিটারের সুর কখনও বিকৃত হয়ে তীব্র হয়, কখনও দূর থেকে ভেসে আসে অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর, আবার কখনও হঠাৎ নেমে আসা নীরবতা তৈরি করে এক চিত্রশোভন বা চলচ্চিত্রোপম আবহ।
শিল্প ও পেশার দ্বৈত সেতুবন্ধ
আইনাস তাজওয়ার হকের ব্যক্তিত্বের একটি কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো তাঁর দ্বৈত শিল্পসত্তা। একদিকে তিনি গড়ে তুলছেন তাঁর ব্যক্তিগত পরীক্ষামূলক সুরের জগৎ, অন্যদিকে তিনি সমানতালে কাজ করছেন বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটক, বিজ্ঞাপন ও ডিজিটাল মাধ্যমের নেপথ্যে। দৃশ্যের আবেগকে শব্দে রূপান্তর করার এক অসামান্য ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। ‘স্টুডিও বাক্স’ এবং ‘স্টুডিও ৮/এ’— এই দুই আঙিনাকে কেন্দ্র করে তাঁর বহুমুখী প্রতিভা বিকশিত হচ্ছে। সেখানে তিনি কখনও সুরকার, কখনও শব্দ স্থপতি, আবার কখনও কারিগরি বিশেষজ্ঞ।
নতুন প্রজন্মের ধ্রুবতারা
বাংলাদেশের স্বাধীন সংগীতচর্চায় বর্তমানে অনেকেই ভিন্ন পথ খুঁজছেন। তবে সুরের একটি পূর্ণাঙ্গ এবং নিজস্ব পরিচয় বা ‘সাউন্ড আইডেন্টিটি’ তৈরি করতে পেরেছেন খুব কম শিল্পীই। আইনাস তাজওয়ার হক সেই বিরল প্রতিভাদের একজন। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার জোয়ারে গা না ভাসিয়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন নিজের এক অটল ‘মহল্লা’। যেখানে ক্লান্ত নগরের রাত, মানুষের হাহাকার আর নিঃসঙ্গ আত্মার দীর্ঘশ্বাস সুর হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।
‘আইনাস মহল্লা’ তাই কেবল একটি সংগীত প্রকল্প নয়; এটি একটি অনুভূতির সংগ্রহশালা। যেখানে প্রতিটি শব্দের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে এক একটি গভীর জীবনবোধ।