আসন্ন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো ধরনের জবাবদিহিতা বা উৎস সংক্রান্ত প্রশ্ন ছাড়াই আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, জমি, ভবন কিংবা ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময় যদি দলিলমূল্যের চেয়ে প্রকৃত লেনদেনের অঙ্ক বেশি হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বপ্রণোদিত হয়ে সেই অতিরিক্ত অর্থের ঘোষণা দিলে নিয়মিত করের মাধ্যমে তা নিয়মিত করতে পারবেন। আবাসন বাজারের স্থবিরতা কাটাতে ক্রেতা এবং বিক্রেতা—উভয় পক্ষকেই এই বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের পক্ষ থেকে এই ধরনের অলস অর্থ মূল ধারায় আনার সুযোগ না রাখার জোরালো দাবি জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থবিলে এই সংক্রান্ত ধারাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রীর মূল বক্তব্যে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা ছিল না। কোনো ধরনের প্রকাশ্য সংসদীয় আলোচনা ছাড়াই অলস অর্থ বৈধ করার এই বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিধানটি সরাসরি অর্থবিলে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত অর্থবিলে বিদ্যমান আয়কর আইন, ২০২৩-এর প্রথম তপশিল সংশোধনীর মাধ্যমে বলা হয়েছে, কোনো করদাতার স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচার ক্ষেত্রে দলিলমূল্যের বাইরে অতিরিক্ত কোনো লেনদেন হয়ে থাকলে, তিনি সেই অপ্রদর্শিত অর্থের ওপর ব্যক্তিশ্রেণির জন্য নির্ধারিত স্বাভাবিক করহারে আয়কর জমা দিতে পারবেন। দেশের প্রচলিত অন্য কোনো আইনে ভিন্ন কিছু উল্লেখ থাকলেও, কোনো নাগরিক নিজে থেকে এই কর পরিশোধ করলে সেই অর্থের উৎস নিয়ে সরকারের কোনো সংস্থা কোনো ধরনের প্রশ্ন তুলতে বা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে না। তবে এই সুবিধা চালুর আগেই যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই সংক্রান্ত কোনো তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়ে থাকে, তবে তাকে নিয়মিত করের পাশাপাশি আরও অতিরিক্ত ২০ শতাংশ জরিমানা বা বাড়তি কর গুনে এই সুবিধা নিতে হবে।
প্রক্রিয়াগত বিষয়ে জানা গেছে, এই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করতে করদাতাকে তার বার্ষিক আয়কর রিটার্নের জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিবরণী বা লাইফস্টাইল ফরমে ‘উৎসে কর্তিত’ অথবা ‘সংগৃহীত কর’ হিসেবে বিষয়টি প্রদর্শন করতে হবে। এর ফলেই সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তারা অর্থটির বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হবেন এবং উৎস নিয়ে আর কোনো আইনি জটিলতা তৈরি করবেন না। তবে কর ফাঁকির এই বিশেষ সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও, যেসকল ব্যক্তি ইতোমধ্যে দেশের কোনো আদালতে আর্থিক অপরাধ বা অর্থ পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তারা এই সুযোগের আওতাভুক্ত হবেন না।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, অলস অর্থ দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিলে বিদেশে অর্থ পাচারের প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। একই সাথে ঘরের টাকা দেশের অর্থনীতিতে সচল হলে বেসরকারি খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিনিয়োগ মন্দা ও স্থবিরতা কেটে যাবে। এই বিষয়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাব-এর সভাপতি ড. আলী আফজাল জানান, অর্থনীতিতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ অলস অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি ছিল। আবাসন শিল্পে বিনিয়োগ সরাসরি নির্মাণ, রড, সিমেন্ট, সিরামিক ও পরিবহনসহ প্রায় শতাধিক সহযোগী শিল্পের চাকা সচল করে তোলে। স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে এই বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে তা যেমন রিয়েল এস্টেট বাজারে গতি আনবে, তেমনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।







