সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালির জটিলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার চরম অস্থিরতার মধ্যেও দেশে কোনো ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
মন্ত্রী জানান, গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের রুট পরিবর্তনের কারণে এই খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক সংকটের জেরে কাতার ও সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের হওয়া কিছু জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ (অনিবার্য বা নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত) পরিস্থিতি দেখা দেয়। এর ফলে পূর্বনির্ধারিত উৎস থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ সাময়িক ব্যাহত হলেও সরকার দ্রুততার সাথে বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ নিশ্চিত করেছে। এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের তেল ক্রয় করে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা সচল রেখেছে, যার ফলে বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানি সংকটে ভুগলেও বাংলাদেশে কোনো ‘ড্রাই’ পরিস্থিতি বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেনি।
তবে বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপ ও বকেয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই এই খাতে বড় ধরনের বকেয়া ও কাঠামোগত ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে বেসরকারি আইপিপি (ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে তা সাধারণ গ্রাহকদের কাছে কম দামে সরবরাহ করার কারণে প্রতি বছর একটি বিশাল আর্থিক ঘাটতি বা গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দায় জমেছে, যা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বহুল আলোচিত ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ (কেন্দ্র ভাড়া) প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সাথেও আলোচনা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক বিনিয়োগকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে ক্যাপাসিটি চার্জ হঠাৎ বন্ধ করে দিলে ব্যাংক ঋণ ও আর্থিক দায় সামলে তাদের পক্ষে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে দেশে নতুন করে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হতে পারে, তাই সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে এই চুক্তিগত জটিলতা নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে এবং তাদের অনুকূল আইনি পরামর্শ (ফেভারেবল অপিনিয়ন) পাওয়া গেলে আইনি কাঠামোর মধ্যেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পুনরায় পূর্ণ সক্রিয় করা হয়েছে এবং সমুদ্র ও স্থলভাগে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমুদ্র সীমানা বিজয়ের পরও দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত হারে গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়া দুঃখজনক মন্তব্য করে তিনি বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিদেশি তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর (আইওসি) সাথে যৌথ অংশীদারিত্বে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হবে। এ ছাড়া, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স এবং পরিবেশের বাধ্যবাধকতার কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে আরও বাড়ানো হতে পারে।
বক্তব্যের শেষ অংশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অতীত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শিতার অভাবের তীব্র সমালোচনা করেন মন্ত্রী। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ডিজিটাল মিটার প্রকল্পের অধীনে ৫ লাখ মিটার অর্ডার দেওয়া হলেও পরিকল্পনাগত ত্রুটির কারণে তার একটি বড় অংশ এখনো ব্যবহার না হয়ে গুদামেই পড়ে আছে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের স্পষ্ট অপচয়। একইভাবে ডিপিডিসির অধীনে ৬৫টি সাবস্টেশন নির্মাণের লক্ষ্য থাকলেও নির্ধারিত সময়ে মাত্র ৩৮টি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল প্রকল্পের অগ্রগতিও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এমনকি রাজধানীর শাহবাগ এলাকার পেছনে টুইন টাওয়ারসহ আন্তর্জাতিক মানের সুইমিং পুল নির্মাণের উন্নয়ন প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব প্রকল্পের আয় কাঠামো ও অর্থনৈতিক যুক্তি অত্যন্ত দুর্বল ছিল, যার ফলে রাষ্ট্রীয় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রফিট বা রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে না।







