দেশে নিবন্ধিত লাখ লাখ মোটরসাইকেল চালক ও মালিকদের জন্য করের বোঝা আরও ভারী হতে চলেছে। আগামী অর্থবছর থেকেই বাইকের ওপর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আদায়ের এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এই সিদ্ধান্ত জানাজানি হতেই সারা দেশের বাইকারদের মনে বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে— কর দেওয়ার মতো ন্যূনতম আয় না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই ট্যাক্স কাটা হবে? কারণ, মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশেরই কোনো করযোগ্য আয় নেই, ফলে তাদের কোনো ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার বা ‘টিন’ (TIN)-ও নেই।
জটিল এই প্রক্রিয়ার কর আদায়ের রূপরেখা কেমন হবে, তা নিয়ে এখন নীতি-নির্ধারণী মহলে জোর আলোচনা চলছে।বর্তমানে বাইক মালিকদের প্রতি বছর বিআরটিএ-র নির্ধারিত ট্যাক্স টোকেন ফি দিয়ে তা নবায়ন করতে হয়। এখন সেই ট্যাক্স টোকেনের সঙ্গে নতুন করে অগ্রিম আয়কর যুক্ত করার এই সরকারি ভাবনাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান।
তিনি এই উদ্যোগকে সমর্থন করে বলেন,‘চিন্তাটা ভালো ও যৌক্তিক। তবে যৌক্তিক হারে করটা নির্ধারণ হতে হবে। টিন নাম্বারের মাধ্যমে নাকি অন্য কোনো পদ্ধতিতে এই কর আদায় করা হবে সেটি এনবিআরকেই ঠিক করতে হবে।’
যদিও এই সিদ্ধান্তের খবর গণমাধ্যমে আসতেই সাধারণ মোটরবাইক চালকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে। কর বাতিলের দাবিতে ক্ষুব্ধ চালকদের একটি অংশ ইতিমধ্যে এনবিআর ভবনের সামনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন এবং চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-র দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে দেশের সড়কে প্রায় ৪৯ লাখের মতো নিবন্ধিত মোটরবাইক চলাচল করছে। বিপুলসংখ্যক এই বাহনকে করের জালে বাঁধতে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এনবিআর কর্তাদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে মোটরবাইক ও থ্রি-হুইলারকে (অটোরিকশা) এআইটির আওতায় আনা এবং বিলাসবহুল বা উচ্চ সিসির গাড়ির অগ্রিম কর আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে ঢাকার সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, করের নেটওয়ার্ক বাড়াতে আপাতত ‘টিন’ নম্বরের বিপরীতেই এই এআইটি কাটার প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, আলোচনার টেবিলে নানা অপশন থাকলেও টিন নাম্বার বাধ্যতামূলক করাটাই সবচেয়ে কার্যকর মনে হচ্ছে। এতে করে বিপুলসংখ্যক নাগরিককে পর্যায়ক্রমে কর ব্যবস্থার শৃঙ্খলায় আনা সম্ভব হবে।
সাবেক এনবিআর প্রধান বদিউর রহমানও এই যুক্তিকে সমর্থন করে বলেন,‘আয়ের দিক থেকে করের ন্যূনতম স্লাব বা ধাপে না থাকলেও মানুষ যাতে করখাতে অবদান রাখার সুযোগ পায় সেজন্যই বাইক মালিকদেরও করের আওতায় থাকা দরকার।’
তিনি আরও যোগ করেন,‘মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনের তো নিয়ম আছে। সে অনুযায়ী এনবিআর প্রসেস করবে কিভাবে কর আদায় করা যায়। এটা এমনি কর হোক, আর এআইটি হোক- সেটা রিজনাবল হতে হবে। এভাবে সবাইকেই করখাতে কন্ট্রিবিউট করার সুযোগ দিতে হবে। সরকারের আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সেটি ভূমিকা রাখবে।’
তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে ভিন্ন একটি বিকল্প নিয়েও ভাবছে এনবিআর। সেটি হলো— টিন সার্টিফিকেটের কোনো বাধ্যবাধকতা না রেখে, প্রতি বছর বিআরটিএ-র ট্যাক্স টোকেনের যে ফি নেওয়া হয়, তার সঙ্গেই এআইটির টাকা এককালীন কেটে নেওয়া। এতে করে স্বল্প আয়ের বাইকারদের বাড়তি আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে না।
সিসি অনুযায়ী সম্ভাব্য করের হার ও অটোরিকশার কর
এনবিআরের অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, ইঞ্জিনের ক্ষমতা বা ‘সিসি’ (CC) বিবেচনা করে করের হার নির্ধারণের খসড়া তৈরি করা হয়েছে:মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা (সিসি)সম্ভাব্য বার্ষিক অগ্রিম আয়কর (এআইটি)১১০ সিসি পর্যন্তকরমুক্ত থাকার সম্ভাবনা বেশি১১১ সিসি থেকে ১২৫ সিসিসর্বনিম্ন ২,০০০ টাকা১২৬ সিসি থেকে ১৬৫ সিসি৫,০০০ টাকা১৬৫ সিসির বেশি১০,০০০ টাকামোটরসাইকেলের পাশাপাশি দেশের ব্যাটারিচালিত ও সাধারণ অটোরিকশাকেও করের আওতায় আনার জোর প্রস্তুতি চলছে। যদিও দেশে অটোরিকশার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই, তবুও এলাকাভেদে বার্ষিক ট্যাক্স নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী অটোরিকশার জন্য ৫ হাজার টাকা, পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ হাজার টাকা কর ধার্য হতে পারে। এই নিয়ম চালু হলে অটোরিকশাগুলোকে স্ব-স্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স নিতে হবে এবং সেই লাইসেন্স ফি’র সঙ্গেই অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হবে।
রাজপথে চালকদের তুমুল প্রতিবাদ ও অসন্তোষ
মোটরসাইকেলের ওপর এই সম্ভাব্য করের বোঝা চাপানোর প্রতিবাদে গত রবিবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদর দপ্তরের সামনে বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন চালকরা।এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া চিঠিতে তারা উল্লেখ করেছেন,‘অগ্রিম আয়করের প্রস্তাব দেশের লাখ লাখ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।’
আন্দোলনকারীরা জানান, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এমনিতেই মোটরসাইকেলের খুচরা মূল্য আকাশচুম্বী। তদুপরি, বর্তমানে দেশের একটা বিশাল বেকার জনগোষ্ঠী রাইড শেয়ারিং অ্যাপ (যেমন পাঠাও, উবার) কিংবা ফুড ও পার্সেল ডেলিভারি দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। এই অবস্থায় নতুন করে হাজার হাজার টাকা ট্যাক্স বসালে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
গত সোমবার (১৮ মে) গুলশানের ১১৩ নম্বর সড়কে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বেশ কয়েকজন পেশাদার বাইকার। শাহাবুদ্দিন নামের একজন চালক ক্ষোভের সুরে গণমাধ্যমকে বলেন,‘আমি ট্যাক্স টোকেন ফি দেই। নতুন করে ট্যাক্স দিলে সেটা অন্যায় হবে।’আরেক চালক রফিক উল্ল্যাহ নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন,‘যারা শখ করে চালায় তাদের জন্য বাড়তি ট্যাক্স ঠিক হতে পারে কিন্তু আমাদের জন্য এটাই আয়ের উৎস। এখানে বাড়তি ট্যাক্স কেন দিবে।’







